বৈষম্যের প্রাচীর: প্রযুক্তির অভাবে চিকিৎসা সেবা
টেলিমেডিসিন— আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার এক নতুন দিগন্ত। ঘরে বসেই ভিডিও কল বা অনলাইনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে এটি। মহামারির সময় যখন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাওয়া ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, তখন এই সেবা জীবন বাঁচানোর মতো ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো—যাদের সবচেয়ে বেশি দরকার, সেই বয়স্ক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীই টেলিমেডিসিন থেকে বঞ্চিত।

ছবিঃ পিক্সেল ডটকম থেকে সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা
করোনার শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে সামনাসামনি চিকিৎসা নেওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এসময় উত্তর ক্যারোলিনার চিকিৎসক কারেন স্মিথ রোগীদের জন্য টেলিমেডিসিন চালু করেন। কিন্তু সমস্যাটা ছিল—তার এলাকায় মাত্র ৪০% মানুষের ব্রডব্যান্ড সংযোগ।
সমাধান আসে ভিন্নভাবে। স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ স্কুলবাসে ওয়াইফাই হটস্পট বসিয়ে বিভিন্ন এলাকায় পাঠাতে শুরু করে। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন অনলাইনে পড়াশোনা চালিয়ে যায়, তেমনি বয়স্করা নিজেদের গাড়িতে বসে একই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে চিকিৎসকের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার সুযোগ পান।
স্মিথ বলেছিলেন, “যদি ৯ বছরের শিশু এই ওয়াইফাই ব্যবহার করে ক্লাস করতে পারে, তবে কেন তার দাদী চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না?”
ডিজিটাল ডিভাইড—এক অদৃশ্য দেয়াল
ডিজিটাল ডিভাইড বা ডিজিটাল বৈষম্য হলো ইন্টারনেট পাওয়া আর না-পাওয়ার ফারাক। শুধু ইন্টারনেট সংযোগ নয়, স্মার্টফোন বা কম্পিউটার কেনার সামর্থ্য এবং ব্যবহার জানার বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ পরিবারে কোনো ধরনের ইন্টারনেট সংযোগ নেই। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকায় সংখ্যাটা সবচেয়ে বেশি। ফলে টেলিমেডিসিনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা সেবা থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশেও মহামারির সময় একই সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষজন ইন্টারনেট ও ডিভাইসের অভাবে টেলিমেডিসিন ব্যবহার করতে পারেননি। অনলাইনে ক্লাসেও অংশ নিতে পারেনি অসংখ্য শিশু-কিশোর।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ৪৬ কোটি ৩০ লাখ শিশু অনলাইনে ক্লাস করতে পারেনি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে। দক্ষিণ এশিয়াতেই এর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লাখ।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা?
গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে মেডিকেয়ার সুবিধাভোগীদের ৪১% এর ঘরেই উপযুক্ত ডিভাইস নেই। কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিন আমেরিকান এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সমস্যাটা আরও তীব্র।
আশঙ্কা ও করণীয়
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি এ বৈষম্য কমানো না যায়, তাহলে টেলিমেডিসিন সেবা প্রসারিত হলেও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বঞ্চিত থাকবে। এর ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে, বাড়বে মৃত্যুহার ও সামাজিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি।

ছবিঃ পিক্সেল ডটকম থেকে সংগৃহীত
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টেলিমেডিসিন কতটা কার্যকরী?
বাংলাদেশে টেলিমেডিসিন স্বাস্থ্যসেবার নতুন দিগন্ত খুলেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ডাক্তার সংকটের কারণে এটি কার্যকর হতে পারে। এতে সময়, ভ্রমণ ও খরচ কমে, জরুরি সময়ে দ্রুত সেবা মেলে।
তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ডিজিটাল বৈষম্য, ইন্টারনেট ও ডিভাইসের অভাব, সচেতনতার ঘাটতি এবং রোগীদের অনাস্থা। অনলাইনে শারীরিক পরীক্ষা করা সম্ভব না হওয়াটাও একটি সীমাবদ্ধতা।
সারকথা, সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে টেলিমেডিসিন বাংলাদেশে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বড় অংশ হয়ে উঠতে পারে।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় সম্ভাবনা:
দেশের প্রায় ৭০% মানুষ গ্রামে বাস করে, যেখানে ডাক্তার সংকট প্রবল। টেলিমেডিসিন তাদের জন্য বিশেষ কার্যকর হতে পারে, কারণ এতে শহরে না গিয়েও প্রাথমিক চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ বা ফলোআপ নেওয়া যায়।
সময়সাশ্রয় ও খরচ কমানো:
রোগীদের ঢাকায় বা জেলা শহরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হলে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি লাগে। টেলিমেডিসিন সেই ঝামেলা কমাতে পারে।
জরুরি সময়ে ভূমিকা:
কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রমাণ হয়েছে যে, রোগী ও ডাক্তার উভয়ের নিরাপত্তার জন্য টেলিমেডিসিন কার্যকরী হতে পারে।
ডিজিটাল বৈষম্য:
গ্রামীণ এলাকায় এখনো অনেক মানুষ ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনেকের কাছে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ নেই।
সচেতনতার অভাব:
অনেকেই জানেন না টেলিমেডিসিন কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, বা অনলাইনে ডাক্তার দেখানো সম্ভব কিনা—সে বিষয়ে তাদের ধারণা নেই।
ভরসার ঘাটতি:
রোগীরা এখনো মনে করেন সরাসরি ডাক্তার না দেখলে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় না। ফলে টেলিমেডিসিনের প্রতি আস্থা গড়ে ওঠেনি।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা:
অনলাইনে ডাক্তার কিছুটা পরামর্শ দিতে পারলেও শারীরিক পরীক্ষা, টেস্ট বা ইনভেস্টিগেশন দরকার হলে সেটা স্থানীয়ভাবে করতে হয়।
বাংলাদেশে ইতিবাচক দিক:
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু উদ্যোগ আছে। যেমন—
‘স্বরাষ্ট্র সেবা’ হেল্পলাইন (৩৩৩)

ছবিঃ মেডিসেফ হেলথের প্রতিকী কার্যক্রম
মহামারির সময় এ সেবার ব্যবহার বেড়েছিল, বিশেষ করে অনলাইনে প্রেসক্রিপশন নেওয়া ও ফলোআপ কনসালটেশনের ক্ষেত্রে।
সার্বিক মূল্যায়ন: