ঢাকার আগারগাঁও এলাকা বর্তমানে নির্বাচনী ভবনের সামনে এক ভিন্ন দৃশ্যের সাক্ষী। রঙ-বেরঙের জন্মদিনের কেক, ঝলমলে আলোকসজ্জা, আর ব্যস্ত বিক্রেতাদের হাকডাকে জমে উঠছে ফুটপাত। তবে এই কেকগুলোর ঝলমলে চেহারার পেছনে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ প্রায় অজ্ঞ।
প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের সামনে এবং আশেপাশের এলাকায় দেখা যায় অগণিত কেক বিক্রেতা। রাস্তার ধারে টেবিল সাজিয়ে রাখা হয় রঙিন কেক—কারও নাম লেখা, কারও উপর স্প্রে পাউডার ছিটানো। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কেক তৈরি হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, অজানা কারখানায়, এবং সংরক্ষণের নিয়ম না মেনে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (BFSA) একটি জরিপ অনুযায়ী, রাজধানীর ৭৫% রাস্তার খাবারে ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে (সূত্র: BFSA রিপোর্ট, ২০২3)। এই কেকগুলিও তার ব্যতিক্রম নয়। রাস্তার ধুলো, মাছি, তাপমাত্রা ও নোংরা প্যাকেজিং এসব খাবারকে দ্রুত দূষিত করে।
কৃত্রিম রঙের ব্যবহার: সুন্দর কিন্তু প্রাণঘাতী
এই কেকগুলোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে তাদের উজ্জ্বল রঙ। গোলাপি, সবুজ, নীল, হলুদ—চোখ ধাঁধানো এসব রঙ মূলত টেক্সটাইল ডাই বা অখাদ্য কেমিক্যাল রঙ থেকে তৈরি হয়।
খাদ্য প্রযুক্তি গবেষণা কেন্দ্রের (IFST, BCSIR) এক পরীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকায় বিক্রি হওয়া ১০টির মধ্যে ৬টি কেকে অ্যালার্জেনিক ও ক্যান্সার-সৃষ্টিকারী রঙ যেমন Tartrazine (E102), Sunset Yellow (E110), এবং Rhodamine B ব্যবহার করা হয়।
Rhodamine B: লিভার ও কিডনির কোষ ক্ষতিগ্রস্ত করে, দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
Tartrazine (E102): শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত চঞ্চলতা (hyperactivity), ত্বকের অ্যালার্জি, এমনকি হাঁপানির প্রবণতা বাড়ায়।
Sudan Red: WHO কর্তৃক নিষিদ্ধ কৃত্রিম রঙ; এটি পাকস্থলীতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
(সূত্র: World Health Organization – “Food Additives and Cancer Risk”, 2022)
কেক তৈরিতে ব্যবহৃত ক্রিম ও হোয়াইট বাটারের বেশিরভাগই তৈরি হয় সস্তা ভেজিটেবল ফ্যাট থেকে, যা সাধারণত শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত পাম তেল। এসব তেল অনেক সময় পুনঃব্যবহৃত বা রিফাইন না করা তেল, যা শরীরে ট্রান্স ফ্যাট বাড়িয়ে হৃদরোগ, উচ্চ কোলেস্টেরল, এবং লিভার সমস্যা সৃষ্টি করে।
এছাড়া কেক সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয় ফরমালিন ও সোডিয়াম বেনজোয়েট, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল করে।
বাংলাদেশ খাদ্য গবেষণা ল্যাবরেটরি (Dhaka Food Lab, 2023) রিপোর্টে বলা হয়—রাস্তার কেকের ৪৮% নমুনায় অবৈধ সংরক্ষণ উপাদান ও অতিরিক্ত চিনি পাওয়া গেছে।
জন্মদিন মানেই শিশুদের আনন্দ, কিন্তু এই কেকগুলোর রঙ ও কেমিক্যাল শিশুদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। শিশুদের শরীরে ওজন অনুযায়ী টক্সিনের প্রভাব অনেক দ্রুত পড়ে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) জানিয়েছে, ৫ বছরের নিচে শিশুদের মধ্যে artificial color intake সীমার অতিরিক্ত হলে মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে (FAO Report, 2021)।
বাংলাদেশে খাবার রঙ ব্যবহারে আইন রয়েছে—খাদ্য বিধিমালা ২০১৭ (Food Safety Regulations, 2017) অনুযায়ী, শুধুমাত্র ৮ ধরনের অনুমোদিত রঙ ব্যবহার করা যায়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এ আইন কার্যকর হয় না।
আগারগাঁওয়ের কেক বিক্রেতারা সাধারণত ফুটপাত বা অস্থায়ী দোকানে ব্যবসা চালান, যেখানে খাদ্য পরিদর্শকরা খুব একটা নজরদারি করেন না। ফলে অনিরাপদ কেক বিক্রি অনায়াসেই চলছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের (DNCRP) মতে, “ভোক্তার সচেতনতা বাড়লে রাস্তার খাবারের ভেজালও কমে।” তাই সবাইকে উচিত—
১. নিয়মিত মনিটরিং: স্থানীয় প্রশাসন ও খাদ্য কর্তৃপক্ষের যৌথ অভিযান।
২. জনসচেতনতা বৃদ্ধি: মিডিয়া, স্কুল ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা।
৩. ল্যাব টেস্ট বাধ্যতামূলক করা: সকল কেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত পরীক্ষা সনদ প্রদর্শন করতে হবে।
৪. ভোক্তা অধিকার হটলাইন ব্যবহারে উৎসাহ: অভিযোগ জানাতে ১৬১২১ নাম্বারে যোগাযোগ।
আগারগাঁওয়ে রঙিন কেকের ঝলমলে আয়োজন আনন্দের প্রতীক মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে নিঃশব্দ স্বাস্থ্যবিপর্যয়। আমাদের উচিত নয় শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নেওয়া। সময় এসেছে সচেতন হওয়ার, কারণ এক টুকরো কেকের আনন্দ যেন ভবিষ্যতের অসুখের কারণ না হয়।
1. Bangladesh Food Safety Authority (BFSA), Annual Report 2023.
2. Institute of Food Science and Technology (IFST, BCSIR), Dhaka, 2022.
3. World Health Organization (WHO) – Food Additives and Cancer Risk, 2022.
4. FAO Report on Food Safety in Developing Nations, 2021.
5. Dhaka Food Lab Research Findings, 2023.
6. Food Safety Regulations of Bangladesh, 2017.