এন্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা: ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ গণবিজ্ঞপ্তি
বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বা এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমেই একটি ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র এন্টিবায়োটিক—অনিয়ন্ত্রিত, ভুল বা অবৈধ ব্যবহারের কারণে আজ অকার্যকর হওয়ার পথে। এমন একটি সংকটজনক পরিস্থিতিতে সরকারি সংস্থা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এন্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহারে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করেছে এবং দেশব্যাপী সকল ফার্মেসী, ফার্মাসিস্ট ও জনসাধারণকে সতর্ক করে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।
বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশিত হয় ১৯ নভেম্বর ২০২৫, স্মারক নং ডিজিডিএ/বিজ্ঞপ্তি/২৯-০২/০৯/১৯৩৫৩। এতে এন্টিবায়োটিকের বিক্রয়, সংরক্ষণ, বিতরণ, প্রেসক্রিপশন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। নিচে বিজ্ঞপ্তির মূল বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো এবং প্রতিটি বিষয় বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
সরকারি বিজ্ঞপ্তির মূল বক্তব্য (হুবহু)
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর
ঔষধ ভবন, মহাখালী, ঢাকা-১২১২
ফার্মেসী’র মালিক/ফার্মাসিস্টগণের প্রতি নির্দেশনা:
১. ঔষধ ও কসমেটিকস্ আইন, ২০২৩ এর ৪০ (ঘ) ধারা মোতাবেক রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতীত Over the Counter ঔষধ ছাড়া এন্টিবায়োটিক বা অন্য কোন ঔষধ বিক্রয় বা বিতরণ করা যাবে না।
২. এন্টিবায়োটিক জাতীয় ঔষধ ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্যাদি রেজিস্টারে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে।
৩. স্পষ্ট স্বাক্ষর ও তারিখসহ এন্টিবায়োটিক বিক্রয়ের ক্যাশমেমো প্রদান করতে হবে।
৪. রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র মোতাবেক রোগীসাধারণ এন্টিবায়োটিক জাতীয় ঔষধের ফুল কোর্স যাতে গ্রহণ করে সে বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করতে হবে।
৫. এন্টিবায়োটিকসহ সকল ঔষধ নির্ধারিত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে।
৬. রেড লেবেল সম্বলিত মোড়কে উপস্থাপণ ব্যতিরেকে এন্টিবায়োটিক জাতীয় ঔষধ ক্রয়-বিক্রয় হতে বিরত থাকুন।
৭. উল্লেখ্য যে, রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতিরেকে এন্টিবায়োটিক জাতীয় ঔষধ বিক্রয় বা বিতরণ করলে এবং এন্টিবায়োটিক ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্যাদি সম্বলিত রেজিস্টার সংরক্ষণ না করলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
১. রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতিরেকে এন্টিবায়োটিক ক্রয়, সেবন বা ব্যবহার হতে বিরত থাকুন।
২. মোড়কে উল্লিখিত মেয়াদ দেখে ঔষধ ক্রয় করুন এবং বিক্রেতার স্পষ্ট স্বাক্ষর ও তারিখসহ এন্টিবায়োটিক ক্রয়ের ক্যাশমেমো সংগ্রহ করুন।
৩. রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী পূর্ণ কোর্স এন্টিবায়োটিক ব্যবহার না করলে জীবাণু এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে যায় যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্নক ঝুঁকিপূর্ন।
৪. সুস্থতা অনুভব করলেও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র মোতাবেক এন্টিবায়োটিক-এর ফুল কোর্স সম্পন্ন করুন।
৫. মেয়াদ উত্তীর্ণ, নষ্ট হওয়া এন্টিবায়োটিক মাটি, পানি বা ময়লা আবর্জনার সাথে না ফেলে আপনার নিকটস্থ ফার্মেসীতে ফেরত দিন।
মহাপরিচালক
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর
ফোন-০২২২২২-৮০৮০৩
Email: dgda.gov@gmail.com
নিচে প্রতিটি অংশের গভীর বিশ্লেষণ ও এর পেছনে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো, যাতে পাঠক ও জনসাধারণ সহজে বিষয়টি বুঝতে পারেন।
১. প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: কেন এই কঠোরতা?
বাংলাদেশে জনসাধারণের মধ্যে ধারণা গড়ে উঠেছে—
“জ্বর হলে এন্টিবায়োটিক নিলেই ভালো হয়।”
কিন্তু বাস্তবে সর্দি-জ্বরের অধিকাংশই ভাইরাসজনিত, যেখানে এন্টিবায়োটিক মোটেও কাজ করে না। চিকিৎসক ছাড়া ভুল অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে—
WHO-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—
২০৫০ সালের মধ্যে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স মানবজাতির সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
২. রেজিস্টার সংরক্ষণ: দেশের ওষুধ ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজেশনে বড় ভূমিকা
এন্টিবায়োটিক বিক্রির ইতিহাস রাখা হলে সরকার—
এসব তথ্য সহজে ট্র্যাক করতে পারবে।
৩. রোগীকে ফুল কোর্স সম্পন্ন করার পরামর্শ: কেন এটি অত্যন্ত জরুরি?
অনেকে ২–৩ দিন ভালো লাগলেই এন্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করে দেন।
এর ফলে:
এটাই AMR (Antimicrobial Resistance)।
৪. রেড লেবেল ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিক্রি নয়
রেড লেবেল নির্দেশ করে—
এই ঔষধ কেবল চিকিৎসকের নির্দেশে গ্রহণযোগ্য।
এটি আইনগত বাধ্যবাধকতা।
৫. মেয়াদোত্তীর্ণ এন্টিবায়োটিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক
নষ্ট বা পুরনো এন্টিবায়োটিক নদী-খাল বা জমিতে গেলে—
সেজন্য ফার্মেসীতে ফেরত দেওয়া বাধ্যতামূলক।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের ৬৫% ফার্মেসীতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিক্রি হয়।
সাধারণ মানুষ নিজেরাই চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করেন—যা ভয়াবহ ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
শিশুদের মধ্যে অযৌক্তিক এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি।
DGDA-এর এই গণবিজ্ঞপ্তি তাই অত্যন্ত সময়োপযোগী।
রেফারেন্স / সূত্রঃ