প্রিয় পুত্র তারেক রহমানের কাঁধে রেখে গেলেন দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের দায়িত্ব
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য, আপোসহীন ও প্রভাবশালী নাম। গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ পদে উত্তরণ—এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বৈরতন্ত্রবিরোধী সংগ্রাম এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় ছিলেন প্রচারবিমুখ। তবে ১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন। ১৯৮২ সালে সামরিক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর দেশের গণতন্ত্র যখন চরম সংকটে, তখনই খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন।
১৯৮৩ সালে তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং তার নেতৃত্বেই গঠিত হয় ৭ দলীয় ঐক্যজোট। এই জোট বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। টানা প্রায় নয় বছর আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।
রাজনৈতিক গবেষকরা মনে করেন, বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা, আপসহীন অবস্থান ও আন্দোলন সংগঠনের ক্ষমতাই এই পতনের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। এই সময় থেকেই তিনি ‘আপোসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের সূচনালগ্ন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার গ্রন্থ ‘খালেদা’-তে উল্লেখ করেছেন—
“বাস্তব অর্থে তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী; ইতিহাস থেকে এই সত্য মুছে ফেলা যাবে না।”
পরবর্তীতে তিনি আরও দুই দফা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার শাসনামলে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অন্যতম উদাহরণ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। প্রথমদিকে বিএনপি এই ব্যবস্থার পক্ষে না থাকলেও গণদাবি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় তিনি সংবিধান সংশোধনে সম্মতি দেন।
এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনকে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক রাখতে সহায়তা করেছে।
রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়াকে বারবার রাজনৈতিক মামলা, কারাবরণ এবং নানা ধরনের নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা ও বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ সত্ত্বেও তিনি আদর্শ থেকে সরে দাঁড়াননি।
তার এই সংগ্রামী ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার আমলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বিচারব্যবস্থার স্বকীয়তা রক্ষায় তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তিনি ছিলেন বাস্তববাদী রাষ্ট্রনায়ক—যিনি প্রয়োজনে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন।
তার শাসনামলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হয় এবং বাংলাদেশ একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পায়।
গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী—এই উত্তরণ বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ তার গ্রন্থ ‘বেগম খালেদা জিয়া: জীবন ও সংগ্রাম’-এ লিখেছেন—
“পুরুষশাসিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি স্বকীয় নেতৃত্ব দিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন।”
বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি নিজেই একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যথার্থই বলেছেন—
“বেগম খালেদা জিয়া একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান।”
একজন আপোসহীন দেশনেত্রীর বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রিয় পুত্র তারেক রহমানের কাঁধে ন্যস্ত হয়েছে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ বহনের গুরুদায়িত্ব। এই উত্তরাধিকার কেবল দলীয় নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাবাহিকতার প্রশ্ন।
রেফারেন্স / সূত্র