বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে দক্ষ মানবসম্পদ, বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসকের অভাব নিয়ে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্ভরশীল ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। আর এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখে চলেছেন ডিপ্লোমা মেডিকেল চিকিৎসকরা, যারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিদিন নিরলসভাবে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে থাকেন।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রকাশিত হলে তাতে ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের পেশাগত স্বীকৃতি, ভূমিকা, দায়িত্ব এবং পরিচয় সংকুচিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর ফলে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল এসোসিয়েশন (BDMA)। সংগঠনের মহাসচিব এস এম মনিরুল ইসলাম সাদাফ এই অধ্যাদেশকে বৈষম্যমূলক, অপ্রয়োজনীয় এবং বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।
অধ্যাদেশের কিছু ধারায় মেডিকেল পেশাজীবীদের একাধিক স্তরে ভাগ করার যে প্রবণতা দেখা গেছে তা স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সংকট তৈরি করতে পারে বলে মত দিয়েছেন ডিপ্লোমা চিকিৎসকরা। তাদের অভিযোগ—
MBBS/BDS চিকিৎসকরা পূর্ণ স্বীকৃতি পাচ্ছেন
কিন্তু ডিপ্লোমা চিকিৎসকদেরকে ‘সহায়ক কর্মী’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে
এটি পেশাগত মর্যাদা সংকুচিত করার সামিল, যা দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও দুর্বল করবে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ ইউনিয়ন সাবসেন্টার, কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে যান।
এ সকল প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি সময় উপস্থিত থেকে সেবা দেন ডিপ্লোমা চিকিৎসকরাই।
কিন্তু BMDC Ordinance 2025 তাদের বাস্তব ভূমিকা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বকে বিবেচনায় নেয়নি। ফলে অধ্যাদেশটি বাস্তবতার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
অধ্যাদেশে ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের জন্য কোন উন্নীত পদ, পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন সুযোগ বা কাঠামোগত ক্যারিয়ার প্ল্যান উল্লেখ নেই।
এসবেই বাধা তৈরি হবে।
ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের সীমাবদ্ধ করার ফলে সম্ভাব্য ক্ষতি হবে:
এসব কারণে ডিপ্লোমা চিকিৎসকরা মনে করছেন, অধ্যাদেশটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ক্ষতিকর।
সংগঠনের মহাসচিব স্পষ্ট ভাষায় বলেন—
“ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের বাদ দিয়ে কোনো স্বাস্থ্যনীতি সফল হবে না। অধ্যাদেশ ২০২৫ বাস্তবতা বিবর্জিত ও বৈষম্যমূলক। এটি অবিলম্বে সংশোধন হতে হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন—
“বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার মূল ভরসা আমরা ডিপ্লোমা চিকিৎসকরাই। আমাদের পেশাগত পরিচয় সংকুচিত করলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
“আমাদের যে তিন বছরের ডিপ্লোমা প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, রোগী ব্যবস্থাপনার দক্ষতা—তা অধ্যাদেশে কোনোভাবে প্রতিফলিত হয়নি।”
“ডিপ্লোমা চিকিৎসকদেরকে BMDC-এর আওতায় এনে সুনির্দিষ্ট আইনগত স্বীকৃতি, লাইসেন্সিং, দায়িত্ব ও সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।”
১. একীভূত স্বাস্থ্যব্যবস্থা বজায় রাখা
পেশাগত বিভাজন বাড়ালে চিকিৎসা খাতে বৈষম্য আরও গভীর হবে।
২. গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবাকে ঠিক রাখতে
দেশের ৬৫% মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা নেন স্থানীয় ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের কাছ থেকে।
৩. রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে
তাদের বৈধ স্বীকৃতি দিলে চিকিৎসা সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।
৪. আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে
অনেক দেশেই মধ্যম-স্তরের চিকিৎসকদের কাঠামোবদ্ধ স্বীকৃতি রয়েছে, বাংলাদেশেও থাকা প্রয়োজন।
৫. স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে
নীতিগত ভালোভাবে পরিকল্পিত কাঠামো ছাড়া স্বাস্থ্যখাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অধ্যাদেশ ২০২৫–এর কিছু ধারা ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তাদের দাবি—
ন্যায্য স্বীকৃতি, পেশাগত মর্যাদা, দায়িত্বের স্পষ্টতা এবং ক্যারিয়ার পথ নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো অধ্যাদেশ গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখতে হলে ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের ভূমিকা স্বীকার করে একটি ন্যায্য, বৈষম্যমুক্ত ও প্রমাণভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা জরুরি।
রেফারেন্স / সূত্র: