চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে চীনা গবেষকদের সাম্প্রতিক আবিষ্কার। তারা এমন এক ধরনের বিশেষ আঠা উদ্ভাবন করেছেন, যা মাত্র ১৮০ সেকেন্ড বা ৩ মিনিটেই ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতে সক্ষম। এই আঠার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বোন–০২’ (Bone-02)।
🔹 ধাতব ইমপ্ল্যান্টের বিকল্প
সাধারণত হাড় ভাঙলে ধাতব প্লেট, স্ক্রু বা অন্যান্য ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহার করতে হয়। এগুলো বসানোর জন্য বড় ছিদ্র করে জটিল অস্ত্রোপচার করতে হয় এবং পরবর্তীতে অনেক সময় সেগুলো অপসারণ করতেও আবারো অস্ত্রোপচার করতে হয়। কিন্তু নতুন এই ‘বোন গ্লু’ শরীরে প্রাকৃতিকভাবে শোষিত হয়ে যায়, ফলে দ্বিতীয়বার অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে না।
🔹 ঝিনুক থেকে প্রেরণা
এই উদ্ভাবনের পেছনে অনুপ্রেরণা এসেছে প্রকৃতি থেকে। গবেষণার নেতৃত্বদানকারী চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের স্যার রান রান শো হাসপাতালের সহযোগী প্রধান সার্জন লিন শিয়েনফেং জানান, পানির নিচে ঝিনুক যেভাবে দৃঢ়ভাবে বিভিন্ন পৃষ্ঠে লেগে থাকতে পারে, সেই বৈশিষ্ট্য থেকেই তিনি এই আঠার ধারণা পান।
ফলে, রক্তময় পরিবেশেও এই আঠা মাত্র ২–৩ মিনিটে হাড়কে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করতে সক্ষম হয়।
🔹 পরীক্ষায় সাফল্য
গবেষকদের দাবি, ‘বোন–০২’ ইতোমধ্যেই পরীক্ষাগারে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার সব মান পূরণ করেছে। বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, যেখানে প্রচলিত চিকিৎসায় ইস্পাতের প্লেট ও স্ক্রু বসাতে সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ার দরকার হয়, সেখানে এই আঠা দিয়ে পুরো কাজ শেষ করা যায় কয়েক মিনিটেই।
চীনের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই ১৫০ জনের বেশি রোগীর ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে এর ফলাফল ইতিবাচক।
🔹 শক্তিমত্তা ও সক্ষমতা
বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে—
এই আঠা সর্বোচ্চ ৪০০ পাউন্ড পর্যন্ত চাপ সহ্য করতে পারে।
পাশ থেকে চাপ পড়লেও এটি ভাঙে না প্রায় ৫ লাখ প্যাসকাল (০.৫ মেগা প্যাসকাল) পর্যন্ত।
ওপর থেকে চাপ পড়লে সহ্য করতে পারে প্রায় ১ কোটি প্যাসকাল (১০ মেগা প্যাসকাল)।
এমন ক্ষমতা একে ধাতব ইমপ্ল্যান্টের শক্ত বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। একই সঙ্গে এটি সংক্রমণ ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে।
🔹 পুরোনো হাড়ের আঠার সীমাবদ্ধতা
বাজারে বর্তমানে বোন সিমেন্ট ও বোন ভয়েড ফিলার থাকলেও এগুলো আঠার মতো কাজ করতে পারে না।
১৯৪০-এর দশকে প্রথম হাড়ের আঠা তৈরি হলেও সেগুলো ছিল জেলাটিন, ইপোক্সি রেজিন ও অ্যাক্রিলেটভিত্তিক।
কিন্তু সেগুলোর বায়ো-কম্প্যাটিবিলিটি না থাকায় মানুষের শরীরে ব্যবহার উপযোগী হয়নি।
🔹 চিকিৎসা বিজ্ঞানে সম্ভাবনা
নতুন ‘বোন গ্লু’ শুধু হাড় ভাঙা রোগীর জন্যই নয়, বরং জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী হাড় সংক্রান্ত অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এর ব্যবহার চিকিৎসা ব্যয় ও সময় উভয়ই কমাতে সাহায্য করবে।
চীনা বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার চিকিৎসা জগতে এক বড় পদক্ষেপ। যদি এর দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল সফল হয়, তবে হাড় চিকিৎসায় প্রচলিত ধাতব ইমপ্ল্যান্টের যুগ শেষ হয়ে গিয়ে শুরু হতে পারে নতুন আঠার যুগ।