আপডেট
কবি কায়কোবাদের স্মৃতিবিজড়িত পিংনা রসপাল জামে মসজিদ: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিস্মৃতির করুণ অধ্যায় একজন আপোসহীন দেশনেত্রীর বিদায়: বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম ও উত্তরাধিকার স্বাস্থ্যখাত সংস্কার খসড়া ও ডিএমএফদের বাদ দেওয়ার বিতর্ক: জুলাই সনদের চেতনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? কিভাবে বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অধ্যাদেশ ২০২৫ (খসড়া) বাতিল বা সংশোধনের জন্য ইমেইল করবেন: সম্পূর্ণ ধাপে ধাপে গাইড বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অধ্যাদেশ ২০২৫: ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের তীব্র আপত্তি, বৈষম্য ও নীতিগত সংকটের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ ডায়াবেটিসে সুচবিহীন রক্ত পরীক্ষা: এমআইটির বিপ্লবী আলোভিত্তিক প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে গ্লুকোজ মনিটরিংয়ের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ ফুটবলের উত্থানের সময়ে তরুণদের অবিবেচক আচরণ: হামজা–শমিতদের উত্তরসূরীদের ভুল পদক্ষেপে নতুন বিতর্ক ডিএমএফ পরিচয়কে ধারণ করে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান: ডিএমএফ নিয়োগ বাস্তবায়ন পরিষদের পক্ষ থেকে বড় ঘোষণা ডিএমএফ নিয়োগ আন্দোলনের জরুরি নোটিশ: ৯ ডিসেম্বরের কর্মসূচি সাময়িক স্থগিত — ন্যায্য দাবির লড়াই অব্যাহত ডিএমএফদের নিয়োগ সংকট: কেন এখনই নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন জরুরি — ১৫ বছরের বাস্তবতা, আন্দোলন ও সমাধান বিশ্লেষণ

চরাঞ্চলে চিকিৎসা সেবা নেই ৫৪ বছর ধরে: উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নিয়োগে সম্ভাব্য সমাধান

চরাঞ্চলে অব্যবহৃত নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসা সংকটের বাস্তব চিত্র
চরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা সেবা বঞ্চনা ও অব্যবহৃত নৌ-অ্যাম্বুলেন্স—এক গভীর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

 

চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত চরাঞ্চলের মানুষ: সরকারের নীতিগত অবহেলায় স্বাস্থ্যসেবার অন্ধকারে লাখো জীবন

 

বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল—যেখানে নদীর বুকে গড়ে ওঠা গ্রামগুলো আজও যেন সভ্যতার প্রান্তসীমায় আটকে আছে। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, দুর্গম নদীপথ, নিয়মিত ভাঙন, এবং স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর চরম অভাব—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলের মানুষ আজও চিকিৎসার আলো থেকে বঞ্চিত।

 

চরাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থা: তালাবদ্ধ দরজা আর অবহেলার প্রতিচ্ছবি

 

মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলের চিত্র যেন আরও ভয়াবহ। উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র দুইটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও একটি সাবসেন্টার থাকলেও সেগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। আজিমনগর ইউনিয়নের একমাত্র সাবসেন্টারটি বহু আগেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

 

 

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয়রা জানান, সপ্তাহে মাত্র একদিন ক্লিনিক খোলা হয়, বাকি পাঁচদিন দরজায় তালা ঝোলে।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, হরিহরদিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (CHCP) রাশেদ মিয়া নিজস্ব ফার্মেসি পরিচালনা করেন পাটগ্রাম বাজারে এবং বেশিরভাগ সময় সেখানেই অবস্থান করেন। ফলে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হন।

 

নৌ-অ্যাম্বুলেন্স: জনগণের কষ্টের মরিচাধরা প্রতীক

 

চরাঞ্চলবাসীর জন্য সরকার বরাদ্দ দিয়েছিল নৌ-অ্যাম্বুলেন্স—যা ছিল একসময় আশার আলো। কিন্তু সেই নৌ-অ্যাম্বুলেন্স এখন অকেজো লোহার স্তূপে পরিণত হয়েছে। আন্ধারমানিক ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, অ্যাম্বুলেন্সটি কাত হয়ে পড়ে আছে, সামনের গ্লাস ভাঙা, ভেতরের আসন ছেঁড়া, যন্ত্রপাতি অকেজো।

 

স্থানীয়দের ভাষায়⁠—

 

“এই নৌ-অ্যাম্বুলেন্স কোনো দিনই আমাদের কাজে লাগেনি। এখন নদী পার হতে হলে মাঝিদের ট্রলারের উপরই ভরসা রাখতে হয়।”

 

জরুরি অবস্থায় রাতে রোগী পারাপার করতে হলে মাঝিদের ফোন করে অনুরোধ করতে হয়—এই হলো চরাঞ্চলের বাস্তব স্বাস্থ্যব্যবস্থা।

 

চিকিৎসা সেবার ভয়াবহ সংকট: মা ও নবজাতকের মৃত্যু বেড়েই চলেছে

 

চরাঞ্চলের নারীরা এখনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন নন। গর্ভকালীন পরীক্ষা, প্রসূতি সেবা বা পুষ্টি পরামর্শ—সবই তাদের কাছে অপরিচিত বিষয়। তারা এখনো প্রথাগত দাইদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রসবকালীন জটিলতা, রক্তক্ষরণ ও সংক্রমণের কারণে বহু নারী এবং নবজাতক প্রাণ হারান।

 

লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ পাটগ্রামের শামেলা বেগম বলেন—

 

“আমার বেটার বউ গর্ভবতী আছিল, ওপারে হাসপাতালে নিতে গেছিলাম, মাঝনদীতেই মারা গেছে।”

 

 

 

একই এলাকার তাসলিমা আক্তার বলেন—

 

“চরে হাসপাতাল নাই, গাইনি ডাক্তার নাই। গর্ভবতী মেয়েরা অনেক কষ্টে থাকে। দাইরা পরীক্ষা বোঝে না, অনেক সময় মা বা বাচ্চা কেউই বাঁচে না।”

 

 

 

পান্নু হোসেন, আরেক স্থানীয় কৃষক বলেন—

 

“আমার বউয়ের সাত মাস চলছে। ডাক্তার নাই, হাসপাতাল নাই। নদীপথে যেতে গেলে সময়মতো নৌকা পাওয়া যায় না। সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে।”

 

 

 

১৬ বছর ধরে SACMO নিয়োগ বন্ধ: চরাঞ্চলের সেবা শূন্য

 

উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের দায়িত্বে থাকা Sub-Assistant Community Medical Officer (SACMO) পদে ২০০৯ সাল থেকে কোনো নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

এর ফলে দেশের অসংখ্য কমিউনিটি ক্লিনিক ও সাবসেন্টার আজ শূন্যপদে পড়ে আছে।

 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের ইচ্ছা থাকলে Diploma in Medical Faculty (DMF) ডিগ্রিধারীদের এই শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব। কারণ ডিএমএফরা মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, জরুরি সেবা ও মা-শিশু স্বাস্থ্যসেবায় প্রশিক্ষিত।

 

চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় স্বল্প সময়ে ডিএমএফ নিয়োগের মাধ্যমে চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার আলো পৌঁছানো অনেক সহজ হতে পারে।

 

চরবাসীর একটাই অনুরোধ:

 

“আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিকে ডাক্তার চাই”

 

চরাঞ্চলের মানুষের একটাই দাবি—চিকিৎসার জন্য দূরদূরান্তে যাওয়া নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হোক।

স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ, নিয়মিত ক্লিনিক চালু রাখা, ও নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় নিয়োগই এখন সময়ের দাবি।

 

 

চরাঞ্চলের মানুষের জীবন যেন নদীর স্রোতের মতোই অনিশ্চিত। একটু সচেতনতা, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং মানবিক উদ্যোগই পারে এই অন্ধকার ভাঙতে। সরকার যদি দ্রুত ডিএমএফ নিয়োগসহ স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা জোরদার করে, তবে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত এই মানুষগুলোও পাবে নতুন জীবনের আশার আলো।

 

 

রেফারেন্স/সূত্র:

 

  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), বাংলাদেশ।
  • মানিকগঞ্জ জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, ২০২৫।
  • স্থানীয় চরবাসীর সাক্ষাৎকার, হরিরামপুর উপজেলা।
  • গণমাধ্যম প্রতিবেদন: দৈনিক প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন (২০২৪-২০২৫)।

 

 


সম্পাদক
মুহাম্মদ রাজু আহমেদ  
প্রকাশিত বুধবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৫


আরো পড়ুন

প্রেগন্যান্সি ক্যালকুলেটর