বাংলাদেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কমিউনিটি ক্লিনিক ছিল সরকারের যুগান্তকারী উদ্যোগ। কিন্তু বর্তমানে এই ক্লিনিকগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত না হওয়ায় প্রান্তিক জনগণ আবারও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলার ধীতপুর কমিউনিটি ক্লিনিক এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। ক্লিনিকটি গত এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে, ফলে এলাকার মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না।
কমিউনিটি ক্লিনিক চালুর মূল লক্ষ্য ছিল—
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে বহু কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যর্থ হচ্ছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকা, প্রশাসনিক উদাসীনতা, অনিয়ম ও অদক্ষ জনবল নিয়োগের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো এখন জনগণের আস্থা হারাচ্ছে।
ময়মনসিংহের ধীতপুর কমিউনিটি ক্লিনিক এক বছর ধরে তালাবদ্ধ। দায়িত্বরত সিএইচসিপি চিকিৎসক মো. এজাজ দীর্ঘ সময় ধরে ক্লিনিকে উপস্থিত হচ্ছেন না। ফলে—
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সরকার যদি প্রশিক্ষিত চার বছরের ডিপ্লোমা চিকিৎসক (ডিএমএফ) নিয়োগ দিত, তাহলে ক্লিনিকটি আজ সচল থাকত। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে তা হচ্ছে না।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার ডিপ্লোমা মেডিকেল চিকিৎসক (ডিএমএফ) বেকার। তারা বছরের পর বছর ধরে সরকারি চাকরির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন।
অন্যদিকে, সরকার ইন্টারমিডিয়েট পাশ অপ্রশিক্ষিত কর্মীদের মাধ্যমে কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনা করছে।
ফলে—
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশিক্ষিত ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের নিয়োগ দিলে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যখাত আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হতো।
জমিদাতা মো. শামসুল হুদা মন্ডল জানান—
“ক্লিনিকে চিকিৎসক নেই। মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আসে, কিন্তু ফিরে যেতে হয়। সরকার যদি এখানে চিকিৎসক নিয়োগ দিত, তাহলে এলাকার মানুষ উপকৃত হতো।”
সাবেক ইউপি মেম্বার মো. আবু তাহের সরদার বলেন—
“অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার কারণে কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। জনগণ এখন আর সরকারের স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগে আস্থা পাচ্ছে না।”
স্থানীয়দের দাবি— সরকার দ্রুত এই ক্লিনিক পুনরায় চালু করে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক নিয়োগ দিক।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান জানান—
“সিএইচসিপি চিকিৎসক মো. এজাজের বেতন বন্ধ করা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। আমরা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত চিঠি দিয়েছি। এখন তারাই ব্যবস্থা নেবেন।”
এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবেই জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা এখন নীতিগত সংকটে ভুগছে। প্রান্তিক জনগণের জন্য যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল, তা এখন অকার্যকর।
সমাধান হিসেবে প্রয়োজন:
1. প্রশিক্ষিত ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের নিয়োগ প্রদান
2. কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ
3. প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধি
4. দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধ
5. স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও পর্যবেক্ষণ
সরকার যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে দেশের প্রান্তিক জনগণ আরও গভীর স্বাস্থ্য সংকটে পড়বে।
কমিউনিটি ক্লিনিক ছিল বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের এক মাইলফলক প্রকল্প। কিন্তু বর্তমানে এই ক্লিনিকগুলো জনগণের আস্থা হারাচ্ছে অনিয়ম, অদক্ষতা ও প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে।
যদি প্রশিক্ষিত ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের যথাযথভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তদারকি বাড়ানো হয়, তাহলে প্রান্তিক জনগণ আবারও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসতে পারবে।
রেফারেন্স / সূত্রঃ
1. স্থানীয় সূত্র: ধীতপুর কমিউনিটি ক্লিনিক, ময়মনসিংহ
2. উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ময়মনসিংহ
3. ন্যাচারাল মেডিকেল রিপোর্ট, ২০২৫
4. স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), বাংলাদেশ সরকার
5. বাংলাদেশ স্বাস্থ্যনীতি ২০১১