প্রাচীনকালের হারিয়ে যাওয়া ঢেঁকি কল: বাংলাদেশের কৃষিতে ট্র্যাডেল পাম্প
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। শস্য উৎপাদনের জন্য সেচ অপরিহার্য। আধুনিক যান্ত্রিক প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়েছে সত্ত্বেও গ্রামের কৃষকরা প্রায়শই মানব-চালিত সেচ পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল ছিলেন। সেই প্রাচীন উদ্ভাবনের মধ্যে ঢেঁকি কল বা ট্র্যাডেল পাম্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ঢেঁকি কল হলো একটি মানব-চালিত সাকশন পাম্প, যা কূপ বা ছোট জলাশয়ের উপর বসানো হয়। এর বৈশিষ্ট্যগুলো:
পানি উত্তোলনের গভীরতা: ৭ মিটার পর্যন্ত।
চালনার প্রক্রিয়া: পায়ের ট্র্যাডেল বা লিভারের মাধ্যমে ধাপে ধাপে পিস্টন সক্রিয় হয়। সিলিন্ডারে সাকশন তৈরি হয় এবং ভূগর্ভস্থ জলকে উপরের দিকে টানা হয়।
পরিবেশবান্ধব: কোন জীবাশ্ম জ্বালানীর প্রয়োজন নেই, সম্পূর্ণ মানব শক্তি দ্বারা পরিচালিত।
সহজ তৈরি ও টেকসই: স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে কৃষকরা এটি সহজেই তৈরি ও মেরামত করতে পারে।
১৯৭৯ সালে শ্রী নরেন্দ্রনাথ সেন ঢেঁকি কল উদ্ভাবন করেন। এটি পুরোপুরি মানব শক্তি চালিত এবং পরিবেশবান্ধব। ঢেঁকি কলের উদ্ভাবন বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে।
ঢেঁকি কল শুধু সেচের উপকরণ নয়, বরং গ্রামীণ কৃষির টেকসই ও মানবিক প্রযুক্তির প্রতীক।
ঢেঁকি কলের প্রতিটি লাফানো ট্র্যাডেল শুধু পানি উত্তোলন নয়, এটি কৃষকের জীবন ও আশা বহন করে।
একজন বৃদ্ধ কৃষক স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন:
“ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বসে ঢেঁকি কল চালাতাম। কখনো হাওরের কূপে পা ভিজে, কখনো সূর্য নেমে যাওয়া পর্যন্ত পা ও হাত ব্যথা সইতে হত। কিন্তু সেই পানি থেকে আমরা ধান লাগাতাম, এবং সেই ধানই আমাদের সংসার চালাত। ঢেঁকি কল শুধু যন্ত্র নয়, আমাদের জীবনের এক অংশ ছিল।”
শিশুদের শেখার মাধ্যম: বাবা-মায়ের সঙ্গে বসে ছোটরা শিখত পানি উত্তোলনের নিয়ম।
পরিবার ও গ্রাম মিলনস্থান: সেচের সময় মানুষ একত্রিত হতো, গল্প হতো, কাজের মাঝে আনন্দ খুঁজে পেত।
ঐতিহ্যবাহী স্মৃতি: পাম্পের কাঠের লিভার, সিলিন্ডার, ট্র্যাডেল-এর শব্দ আজও অনেক বৃদ্ধ কৃষকের স্মৃতিতে বেঁচে আছে।
ঢেঁকি কল প্রমাণ করে যে দেশীয় উদ্ভাবন ও মানবিক আবেগ একসাথে কৃষি সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। শ্রী নরেন্দ্রনাথ সেনের উদ্ভাবন আধুনিক প্রযুক্তির পথ সুগম করলেও গ্রামীণ জীবনে এর আবেগময় স্মৃতি আজও অম্লান।
ঢেঁকি কল, ট্র্যাডেল পাম্প, বাংলাদেশ কৃষি, সেচ পদ্ধতি, মানব-চালিত পাম্প, পরিবেশবান্ধব কৃষি।
রেফারেন্স / সূত্র
1. নরেন্দ্রনাথ দেব, “ঢেঁকি কল উদ্ভাবন সংক্রান্ত নথি”, ১৯৭৯।
2. বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), “বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সেচ পদ্ধতি”, ২০০৫।
3. কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE), বাংলাদেশ, “সেচ ও জল ব্যবস্থাপনা”, ২০১০।