ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের অবহেলা ও নিয়োগবঞ্চনা এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। জানুন কেন তারা “Diploma Medical Education Board” গঠনের দাবি তুলেছেন।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে ডিপ্লোমা চিকিৎসকরা এক অস্বীকার্য বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হয়ে আসছেন। ৪ বছর মেয়াদী একাডেমিক ও ৬ মাস ইন্টার্নশিপসহ মোট সাড়ে চার বছরে ডিপ্লোমা মেডিকেল কোর্স সম্পন্ন করে একজন শিক্ষার্থী “Diploma in Medical Faculty (DMF)” ডিগ্রি অর্জন করেন The State Medical Faculty of Bangladesh থেকে।
এই ডিগ্রি অর্জনের পর তারা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) কর্তৃক নিবন্ধনপ্রাপ্ত হয়ে বৈধভাবে চিকিৎসা সেবা প্রদানের অনুমতি পান। অর্থাৎ, এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা ছিল।
তবে বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, একাডেমিক মূল্যায়ন ও পেশাগত রেজিস্ট্রেশনের পরও তারা পেশাগত স্বীকৃতি, সরকারি চাকরি ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে বছরের পর বছর বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্বাস্থ্যখাতে ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের প্রতি অবহেলা নতুন নয়। তবে গত ১৬ বছরে এ বৈষম্য আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত সরকার এই সময়ে একজন ডিপ্লোমা চিকিৎসককেও সরকারি নিয়োগ দেয়নি।
চার বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও রেজিস্ট্রেশনধারী এই চিকিৎসকদের পরিবর্তে সরকার ইন্টারমিডিয়েট পাশ করা ব্যক্তিদের, যারা মাত্র তিন থেকে ছয় মাসের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাদের Community Health Provider (CHP) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
এই CHP কর্মীরা BMDC নিবন্ধিত নন, অর্থাৎ তারা আইনি দিক থেকে চিকিৎসা প্রদানের যোগ্যতা রাখেন না।
এর ফলে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আসল স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার “স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার” লঙ্ঘনের সমান।
এই অবহেলার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এখনো দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি রয়েছে।
প্রায় এক লাখেরও বেশি ডিপ্লোমা চিকিৎসক বর্তমানে বেকার অবস্থায় আছেন, যারা দীর্ঘ চার বছরের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ শেষ করেও পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে ব্যর্থ হয়েছেন।
অনেকে বেঁচে থাকার তাগিদে পেশা পরিবর্তন করছেন, কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন— যা দেশের জন্য মেধা পাচার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এক বড় ক্ষতি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি এই প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে প্রাথমিক ও গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব হতো।
সম্প্রতি সরকার “Allied Health Professionals Board” নামে একটি নতুন বোর্ড গঠন করেছে।
ডিপ্লোমা চিকিৎসক সমাজের দাবি, এই বোর্ড তাদের পেশাগত মর্যাদাকে আরও হ্রাস করবে এবং তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় মুছে দেবে।
তাদের মতে, এই বোর্ডের আওতায় এনে ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের “প্যারামেডিক্যাল পেশাজীবী” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে, যা তাদের প্রকৃত পেশাগত মর্যাদার পরিপন্থী।
ডিপ্লোমা চিকিৎসকরা বলছেন—
“এলাইড হেলথ প্রফেশনালস বোর্ড গঠন করা হয়েছে আমাদের স্বতন্ত্রতা নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যে। আমরা এই অন্যায় মেনে নেব না।”
বাংলাদেশের প্রায় এক লক্ষ ডিপ্লোমা চিকিৎসক সর্বসম্মতভাবে “এলাইড হেলথ বোর্ড” প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তারা দাবি করেছেন, এই বোর্ড গঠন ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের প্রতি এক ধরনের প্রশাসনিক অবিচার ও পেশাগত অপমান।
তাদের একটাই দাবি—
“Diploma Medical Education Board of Bangladesh” নামে একটি স্বতন্ত্র বোর্ড গঠন করতে হবে, যা একাডেমিক, প্রশাসনিক ও পেশাগত সকল বিষয় পরিচালনা করবে।
এই প্রস্তাবিত বোর্ডের অধীনে—
এর ফলে বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মধ্যম পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর, নিয়ন্ত্রিত ও জনগণের কাছে সহজলভ্য হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজারো শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা মেডিকেল কোর্স সম্পন্ন করে।
তারা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সম্পৃক্ত হতে না পারায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো দুর্বল হচ্ছে।
যদি এই শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত ও নিবন্ধিত চিকিৎসকদের পেশাগত সুযোগ বৃদ্ধি করা হয় এবং সরকারি নিয়োগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে তা গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন—
“ডিপ্লোমা চিকিৎসকরা হলো বাংলাদেশের কমিউনিটি হেলথ সার্ভিসের মূল ভরসা। তাদের উপেক্ষা করে স্বাস্থ্যসেবা টেকসই হবে না।”
ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের আন্দোলন কেবল নিজেদের পেশাগত অধিকার আদায়ের জন্য নয়; এটি দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের আন্দোলন।
তাদের দাবি, ন্যায্য মর্যাদা ও সুযোগ পেলে তারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কার্যকর ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে পারবেন।
এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে সরকার যদি দ্রুত “Diploma Medical Education Board” গঠনের উদ্যোগ নেয়, তাহলে তা শুধু একটি পেশাগত ন্যায়বিচারই নয়— বরং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে।
🟦 রেফারেন্স / সূত্রঃ