বাংলাদেশে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করা হয়। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য ছিল—‘গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া’।
কিন্তু বাস্তবে এই সেবা সংকটে পড়েছে। জনবল ঘাটতি এখন সারাদেশের কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রধান সমস্যা।
প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে থাকার কথা:
১ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি)
১ জন স্বাস্থ্য সহকারী (এইচএ)
১ জন পরিবার কল্যাণ সহকারী (এফডাব্লিউএ)
অর্থাৎ, মোট ৩ জন কর্মী। কিন্তু অনেক ক্লিনিকে এক বা একাধিক পদ শূন্য। কোথাও আবার পুরো ক্লিনিকই জনবলশূন্য। ফলে স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে এবং গ্রামীণ মানুষ জরুরি সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
উদাহরণ: সোনারগাঁওয়ের কমিউনিটি ক্লিনিক
নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলায় ৩৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে অনেক ক্লিনিকে স্বাস্থ্য সহকারী বা পরিবার কল্যাণ সহকারী নেই।
সাদীপুর ইউনিয়নের ভারগাঁও ও বরগাঁও
কাঁচপুর ইউনিয়নের কুতুবপুর
সনমান্দি ইউনিয়নের কাফাইয়াকান্দা ও চেঙ্গাকান্দি
আমিনপুর ইউনিয়নের দরপত
বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের পঞ্চবটি
পিরোজপুর ইউনিয়নের তাতুয়াকান্দা
এগুলোতে স্বাস্থ্য সহকারী নেই। এছাড়া, আরও কয়েকটি ক্লিনিক পরিবার কল্যাণ সহকারী ছাড়া চলছে। সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা যায় বারদী ইউনিয়নের নুনেরটেক ক্লিনিকে—এখানে কোনো সিএইচসিপি, স্বাস্থ্য সহকারী বা পরিবার কল্যাণ সহকারী নেই। সপ্তাহে একদিন অন্য ক্লিনিক থেকে স্বাস্থ্যকর্মী এনে সেবা দিতে হয়।
ভোগান্তির কথা
রোগীরা জানান, নিয়মিত ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী না থাকায় সামান্য চিকিৎসার জন্যও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়, যা গ্রামীণ মানুষের জন্য কষ্টকর।
নারীরা বলেন, পরিবার কল্যাণ সহকারী না থাকায় টিকা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা সেবা যথাযথভাবে পাচ্ছেন না।
সিএইচসিপিরা জানান, প্রতিদিন গড়ে ৬০-৭০ জন রোগী আসেন। সহকারী না থাকায় একা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, এটি শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় সমস্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নিয়োগ না আসায় এই সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলছে। জেলা সিভিল সার্জনদের দাবি—শিগগিরই পদ পূরণ হলে পরিস্থিতি উন্নত হবে।
১১ বছর ধরে কোনো নিয়োগ নেই
২০১৪ সালের পর থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (Sub-Assistant Community Medical Officer) পদে কোনো নিয়োগ হয়নি। বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার পদ শূন্য।
করোনা মহামারিতে সামনের সারিতে কাজ করা প্রায় ৩০ হাজার ডিপ্লোমা চিকিৎসক আজ বেকার। ১১ বছর ধরে কোনো নিয়োগ না হওয়ায় তারা দীর্ঘকাল কর্মহীন। বিভিন্ন সময় আন্দোলন ও দাবি জানালেও সরকারের পদক্ষেপ হয়নি।
ডিএমএফ চিকিৎসকদের দাবি
কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রাণ ফেরাতে ডিএমএফ চিকিৎসকদের দ্রুত নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন মুহাম্মদ রাজু আহমেদ।
তিনি বলেন ー
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার প্রাণকেন্দ্র কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো আজ জনবল সংকটে হিমশিম খাচ্ছে। সোনারগাঁও থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জেলা ও ইউনিয়নে একই চিত্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের দ্রুত নিয়োগই এ সংকট সমাধানের একমাত্র পথ।