ডিএমএফ–চিকিৎসক দ্বন্দ্বের নতুন বিশ্লেষণ: সীমারেখা মানলেই সমাধান—উপপরিচালক ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফীর স্পষ্ট বার্তা
বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি আলোচিত ও জটিল ইস্যু—ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (ডিএমএফ) ডিগ্রিধারী সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (SACMO)দের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রিধারী চিকিৎসকদের দ্বন্দ্ব—সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষত নামের আগে ‘ডা.’ বা ‘ডাক্তার’ উপাধি ব্যবহারকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক বহুদিন ধরে স্বাস্থ্যখাতের অভ্যন্তরে বিভাজন, বিরোধ এবং পেশাগত অসামঞ্জস্য তৈরি করেছে।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (হাসপাতাল-১) ও আলোচিত স্বাস্থ্য প্রশাসক ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে এই দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের মূল কারণ, আইনি অবস্থান ও বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও যুক্তিনির্ভর মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যখাতে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে—ডিএমএফ–চিকিৎসক দ্বন্দ্বের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে?
স্বাস্থ্যসেবা একটি সমন্বিত টিমওয়ার্ক—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নির্ধারণ করেন, নার্স চিকিৎসা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন, আর SACMOসহ অন্যান্য কারিগরি জনবল মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু বাস্তবতায় বহু গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসকের সংকট চরম। এই সুযোগে এবং পেশাগত কাজের চাপের বাস্তবতায় অনেক সময় SACMOরা প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করেন। এখান থেকেই কিছু ক্ষেত্রে ভুল ধারণা গড়ে ওঠে—যে তারা ‘চিকিৎসক’ পরিচয়ে নিজেদের দাবি করতে পারবেন।
ডা. শাফী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন:
“সারা বিশ্বেই ‘ডাক্তার’ উপাধি MBBS, BDS এবং তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী পেশাজীবীদের জন্য সংরক্ষিত। SACMOদের নামের আগে ‘ডা.’ ব্যবহার আইনসিদ্ধ নয়—এ বিষয়ে আদালতের একাধিক রায় রয়েছে।”
এখানেই দ্বন্দ্বের সূচনা। নামের আগে ‘ডা.’ ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন মহল SACMOদের আইনি লড়াইয়ে উসকে দিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে তৈরি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষ, বিভ্রান্তি ও প্রশাসনিক সম্পর্কের টানাপোড়েন।
বাংলাদেশের একাধিক আদালত রায়ে স্পষ্ট করেছেন—
MBBS, BDS বা তার উচ্চতর ডিগ্রি ছাড়া কেউ চিকিৎসক হিসেবে নিজের নামের আগে ‘ডাক্তার’ লিখতে পারবেন না।
আইনি অবস্থান এত পরিষ্কার হওয়ার পরও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ডা. শাফী। তিনি বলেন:
“মধ্যস্বত্বভোগী একটি গোষ্ঠী SACMOদের ভুল পথে পরিচালিত করেছে এবং তাদের আবেগ ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নিয়েছে। ফলে তারা মামলা, রিটের ঘূর্ণিতে আটকা পড়েছে।”
এমন আইনি যুদ্ধ শুধু প্রশাসন ও মাঠপদস্থ কর্মীদের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ায়—স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ডা. শাফীর বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো—
আইনি সীমারেখা ও চাকরিবিধি মেনে চললেই বহু বছরের দ্বন্দ্বের সমাধান সম্ভব।
তিনি বলেন:
“চাকরিবিধির মধ্যে থেকেই দাবি আদায় করতে হয়। প্রশাসনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাড়িয়ে অধিকার আদায়ে কখনোই সফল হওয়া যায় না।”
অর্থাৎ SACMOরা স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও—
তাদের কাজ, দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা চিকিৎসকদের সমতুল নয়; বরং তারা স্বাস্থ্যসেবা টিমের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সহযোগী অংশ।
ডা. শাফী তাঁকে ঘিরে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করে বলেন—
তিনি SACMOদের বেতন-কাঠামো, মানসম্মত শিক্ষা, ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ, পদসৃজন এবং জীবনমান উন্নয়নসহ সব ন্যায্য দাবির পক্ষে।
তাঁর ভাষায়:
“তাদের কাজ, ত্যাগ ও অবদান আমরা অস্বীকার করছি না। ন্যায্য দাবির জন্য আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করব।”
প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা এই দাবিগুলো পূরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এ বিষয়টিও তিনি জোর দিয়ে বলেন।
ডা. শাফীর গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য:
“রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবিভাগ আপনাকে যেভাবে দেখতে চায়, চাকরিবিধি মেনে সেভাবেই চলতে হবে।”
এর মানে—রাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিতে চাওয়া শুধু বেআইনি নয়, বরং তা পেশার সম্মান ও বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি আরও বলেন:
“প্রশাসন সন্তুষ্ট থাকলে ন্যায্য দাবিদাওয়া পূরণ অনেক সহজ হয়।”
এই বক্তব্যের মূলকথা—সংঘাতে নয়, বরং সহযোগিতায় সমাধান।
বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সংখ্যক MBBS চিকিৎসক নেই। ফলে SACMOরা বহু বছর ধরে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, প্রাথমিক রোগ নির্ণয়, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও কমিউনিটি পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
তাদের অবদান অনস্বীকার্য—
কিন্তু তবুও আইনের চোখে তারা চিকিৎসক নন; তারা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, যাদের কাজ নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যেই মূল্যবান।
দীর্ঘদিনের পারস্পরিক ভুলবোঝাবুঝি, বিভ্রান্তি, অনৈতিক পরামর্শ ও আইনি দ্বন্দ্ব এই ইস্যুকে আরও জটিল করেছে।
তবে ডা. শাফীর বক্তব্যের মাধ্যমে একটি বিষয় পরিষ্কার—
চিকিৎসক এবং সহায়ক স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে পেশাগত সম্মান, দায়িত্ববণ্টন ও আইনি কাঠামো মেনে চলার মাধ্যমেই এই বহু বছরের দ্বন্দ্বের সমাধান সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেফারেন্স / সূত্র
১. স্বাস্থ্য অধিদপ্তর – পেশাগত আচরণ ও চাকরি বিধি
২. বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) আইন
৩. একাধিক হাইকোর্ট রায় (MBBS/BDS ছাড়া ‘ডাক্তার’ উপাধি ব্যবহার নিষিদ্ধ)
৪. ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফীর সামাজিক যো
গাযোগমাধ্যম স্ট্যাটাস, ২০২৫
৫. স্বাস্থ্য খাতে SACMO পদের কাঠামো ও দায়িত্ববণ্টন সংক্রান্ত সরকারি নীতিমালা