বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত বৈষম্য, গ্রেড–পদোন্নতি বৈষম্য, শূন্যপদ সংকট এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষ করে এসএসিএমও (Sub-Assistant Community Medical Officer), মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, স্বাস্থ্য সহকারী, সিএইচসিপি এবং অন্যান্য টায়ারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বছরের পর বছর শ্রেণীগত বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। এসব বঞ্চনার বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন এবং একইসঙ্গে প্রশাসনের আন্তরিকতা—দুইয়ের পারস্পরিক বোঝাপড়ায় বিভ্রান্তি, উসকানি ও কূটচাল পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডাঃ সৈয়দ আবু আহাম্মেদ শাফী প্রদত্ত বার্তার আলোকে এই প্রতিবেদনটি স্বাস্থ্যখাতে চলমান পরিস্থিতি, প্রশাসনিক অবস্থান, অভ্যন্তরীণ বিভাজন, গুজব-অপপ্রচার এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ—এসবের এক বিস্তৃত বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে।
প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ,
বিশেষভাবে আমাদের এসএসিএমও, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, স্বাস্থ্য সহকারী, সিএইচসিপি এবং অন্যান্য টায়ারের কর্মকর্তা–কর্মচারীগণ যারা দীর্ঘদিন বিভিন্ন শ্রেণীগত বঞ্চনার শিকার হয়েছেন—আপনাদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনের প্রতি আমি সম্মান জানাই।
আপনারা অবগত আছেন, স্বাভাবিক সময়ে স্বল্পমেয়াদি ইন্টেরিম সরকার জাতীয় নির্বাচন আয়োজন ও রুটিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে; মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন সাধন তাদের দায়িত্ব নয়। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৪–পরবর্তী বিশেষ রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে এই সরকার অতীতের দীর্ঘ বৈষম্যে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর দাবি–দাওয়া শোনার এবং যুক্তিসঙ্গত ক্ষেত্রগুলোতে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা এবং তার উপদেষ্টা পরিষদ বিভিন্ন সেক্টরের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং সময় ও বাস্তবতার সীমাবদ্ধতার মধ্যে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করেছেন; প্রচেষ্টা এখনো চলমান।
স্বাস্থ্যখাতে বহু বছর ধরে ভেঙে পড়া প্রশাসনিক কাঠামো, স্বৈরাচারী প্রক্রিয়া, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা—এসব কারণে সকল শ্রেণীর কর্মকর্তা–কর্মচারী বঞ্চনার শিকার হয়েছেন।
বর্তমান প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সচিবালয় ও মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে সকল দাবিদাওয়ার বাস্তবতা বুঝে সমাধানের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে চলেছেন।
সহকর্মীদের সাথে আলোচনায় এবং বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দু’টি সমস্যা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে:
১. ফ্যাসিস্ট সরকারের পুরনো সহযোগীদের বিভ্রান্তি ও উসকানি ছড়ানো
তারা আন্দোলনকে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে, কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টায় লিপ্ত।
২. নেতৃত্বের ভেতরে গ্রুপিং এবং প্রতিযোগিতা
একদল কাজ এগিয়ে নিতে চাইলে আরেকদল নিজেদেরকে বড় নেতা প্রমাণ করতে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এতে সাধারণ কর্মীদের আস্থা দুর্বল হচ্ছে।
এছাড়া কিছু ব্যক্তি অতীতে সুবিধাভোগী হওয়ায় এখন নেতৃত্বের বাইরে পড়ে গিয়ে উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
অনেকবার অনুরোধ করার পরও বিভিন্ন গ্রুপ, ফেসবুক পেজ এবং ওয়ালে নিয়মিত প্রশাসনবিরোধী গুজব ছড়ানো হচ্ছে।
এটি—
✔ চাকরির শৃঙ্খলার লঙ্ঘন
✔ প্রশাসনের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব
✔ দাবিদাওয়া বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা—সবই তৈরি করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে তাদের সব দায়িত্ব সম্পন্ন করেছে।
এখন সিদ্ধান্ত—
✔ মন্ত্রণালয়
✔ আন্তঃমন্ত্রণালয়
✔ নির্বাচন-পূর্ব প্রশাসনিক ব্যস্ততা
—এসবের ওপর নির্ভর করছে।
ইন্টেরিম সরকারের হাতে নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় নেই। চলমান কাজগুলো শেষ করাই এখন প্রধান সাফল্য।
উসকানিমূলক ও বিভ্রান্তিমূলক পোস্টের সব প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সহনীয় সীমা অতিক্রম করলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যারা মনে করেন তারা আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি—তাদের উচিত সরাসরি মন্ত্রণালয়ে গিয়ে প্রমাণ করা।
অনলাইন–অফলাইনে উসকানি নয়।
“কথা বলা সহজ—কাজ করা কঠিন।”
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘ বৈষম্যের শুরু বহুআগে। বিভিন্ন টায়ারের গ্রেড বৈষম্য, ইনক্রিমেন্ট, ভূমিকা পুনঃসংজ্ঞা, জনবল কাঠামো—এসব সমন্বয় হয়নি ১৫–২০ বছর। ফলাফল—
প্রতিবাদ, আন্দোলন, স্মারকলিপি—সবই হয়েছে।
যা হয়নি—সমন্বিত ও ন্যায্য সমাধান।
এসএসিএমও–টেকনোলজিস্ট–স্বাস্থ্য সহকারীদের বড় সিদ্ধান্তগুলো সাধারণত—
ইন্টেরিম সরকার এসব করতে আইনগত ও সময়গতভাবে সীমাবদ্ধ।
তাই সমাধানের উদ্যোগ থাকলেও শেষ মুহূর্তে ফাইল আটকে যাওয়াই স্বাভাবিক বাস্তবতা।
স্বাস্থ্যখাতের একটি বড় সমস্যা হলো—
“প্রতিটি আন্দোলনের ভেতরে হঠাৎ কিছু অচেনা নেতৃত্ব জন্ম নেয়।”
এরা—
তারা আন্দোলনকে প্রভাবিত করতে—
ফলে আসল প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ডিজি অফিস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সচিবালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ—সকলেই বঞ্চনা নিরসনে বিভিন্ন ফাইল এগিয়ে নিয়েছে।
কিন্তু—
✔ নির্বাচন
✔ সময় সংকট
✔ আন্তঃমন্ত্রণালয় অনুমোদন
✔ বাজেট আপডেট
এসবের কারণে ফাইল আটকে আছে।
এটা ইচ্ছাকৃত নয়—এটা প্রশাসনিক বাস্তবতা।
যদি উসকানি–গুজব অব্যাহত থাকে—
এই প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞদের মতে—
🔹 প্রশাসনের সাথে সম্মানজনক যোগাযোগ
🔹 দলভাগ বন্ধ করা
🔹 যাচাইবিহীন গুজব শেয়ার বন্ধ
🔹 প্রতিনিধিত্বে যোগ্যতা নিশ্চিত করা
🔹 নির্বাচনের পর স্থায়ী সরকারের সাথে সমন্বয়ের পরিকল্পনা
এসবই কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারে।
রেফারেন্স / সূত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট)
প্রশাসনিক কাঠামো বিশ্লেষণ প্রতিবেদন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
জনস্বাস্থ্য খাতের নির্দেশিকা (২০১৮–২০২৪)
জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি দলিল
প্রদত্ত মূল বক্তব্য—ডাঃ সৈয়দ আবু আহাম্মেদ শাফী