বাংলাদেশ তার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক দশক ধরে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা মূলত রোগ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার ওপর জোর দিয়েছে, অথচ প্রতিরোধমূলক ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা কার্যক্রম বরাবরই অবহেলিত রয়ে গেছে। গ্রামীণ এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভাঙাচোরা ও অকার্যকর—কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতা, জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি এবং সেবার ধারাবাহিকতার অভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। পৌরসভা ও নগর এলাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।
কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা না থাকায় লাখো মানুষ—বিশেষ করে দরিদ্র, নারী, শিশু ও প্রবীণরা—একটি নিয়ন্ত্রণহীন, ব্যয়বহুল নগর স্বাস্থ্যবাজারে নিজেরাই সেবা খুঁজে নিতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ পরিবারগুলোকে সুস্থ রাখা, ব্যয়বহুল চিকিৎসা এড়ানো এবং উৎপাদনশীল জীবনযাপন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও কমিউনিটিভিত্তিক সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অ-সংক্রামক রোগের বোঝা, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি, বৈষম্য এবং অতিরিক্ত স্বাস্থ্যব্যয়ের চাপে আক্রান্ত বাংলাদেশের জন্য কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা এখন শুধু নীতি নয়, একটি জাতীয় বাধ্যবাধকতা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্রনিক শ্বাসযন্ত্রের রোগ ও ক্যানসারের মতো অ-সংক্রামক রোগ বর্তমানে বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর ৬৬ শতাংশেরও বেশি অংশীদার। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, উচ্চ রক্তচাপ, তামাক ব্যবহার, বায়ুদূষণ ও মানসিক চাপের মতো ঝুঁকিগুলো বছরের পর বছর নীরবে এসব রোগ সৃষ্টি করে।
এই ঝুঁকিগুলো খুব অল্প খরচে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নিয়মিত স্ক্রিনিং, কাউন্সেলিং, আগাম রোগ শনাক্তকরণ, জীবনধারা পরামর্শ ও ফলো-আপ সেবার মাধ্যমে—যা সবচেয়ে কার্যকর কমিউনিটিভিত্তিক সেবায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কমিউনিটি পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করলে স্ট্রোক ও কিডনি বিকলের মতো জটিলতা ৩০–৪০ শতাংশ কমে, ফলে ব্যয়বহুল হাসপাতাল চিকিৎসার প্রয়োজনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা নারী, শিশু ও প্রবীণদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন—যাদের চিকিৎসা পাওয়ার পথে নানা বাধা রয়েছে। বাংলাদেশে এখনো মাতৃ রক্তস্বল্পতা, শিশু খর্বতা ও পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদার মতো উদ্বেগজনক পরিস্থিতি প্রকট।
২০২২ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (BDHS) অনুযায়ী—
এসব সমস্যা সমাধানে নিয়মিত পুষ্টি পরামর্শ, প্রসবপূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী সেবা, বুকের দুধ খাওয়ানোর সহায়তা, বাড়িভিত্তিক সেবা এবং শিশুর প্রাথমিক বিকাশ কার্যক্রম অত্যন্ত জরুরি—যা সর্বোত্তমভাবে সম্ভব কমিউনিটি পর্যায়ে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যয়ের হার এশিয়ার মধ্যে অন্যতম উচ্চ। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস ২০২৩ অনুযায়ী—
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এই বোঝা নাটকীয়ভাবে কমাতে পারে।
ডায়াবেটিস শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করলে পায়ের জটিলতা বা কিডনি বিকলের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা এড়ানো যায়। উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধের খরচ হৃদরোগের চিকিৎসার তুলনায় অনেক কম।
প্রতিরোধমূলক সেবায় বিনিয়োগ করা প্রতিটি টাকা—চিকিৎসা, যাতায়াত, হাসপাতালে ভর্তির খরচ এবং কর্মদিবস হারানো থেকে—অনেক গুণ বেশি সাশ্রয় এনে দেয়।
বাংলাদেশের এখন জরুরি প্রয়োজন—
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা।
এতে রোগের বোঝা কমবে, পরিবারগুলো অর্থনৈতিক ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে এবং একটি স্বাস্থ্যবান, উৎপাদনশীল জনশক্তি গড়ে উঠবে। নারী, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বাড়ির কাছেই নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাবে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিশ্বাস করে—স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে অসুস্থ হওয়ার আগেই সুরক্ষা দেওয়া। তাদের অগ্রাধিকার হলো প্রতিরোধ, সহজপ্রাপ্যতা এবং এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা যেখানে কোনো পরিবার অসুস্থতার কারণে নিঃস্ব না হয়।
বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির মূল ভিত্তি মানবকল্যাণ, সমতা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাভিত্তিক আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা। আগাম ঝুঁকি শনাক্ত, রোগের তীব্রতা কমানো এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সময়মতো সেবা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।
তারেক রহমান ও বিএনপি প্রতিরোধমূলক ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা সেবাকে স্বাস্থ্য সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন—যেখানে কমিউনিটিভিত্তিক সেবা হবে মানোন্নয়ন, ব্যয় হ্রাস এবং নাগরিকদের জন্য সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী চিকিৎসার ভিত্তি।
একটি সুস্থ, সহনশীল ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়তে হলে পরিবর্তন শুরু করতে হবে কমিউনিটি স্তর থেকে—যেখানেই প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা
_________