জন্ডিস এমন একটি উপসর্গ যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের কাছে পরিচিত। কিন্তু অনেকেই এখনো মনে করেন জন্ডিস একটি রোগ — আসলে এটি কোনো রোগ নয়, বরং বিভিন্ন রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ। এই অবস্থায় রক্তে “বিলিরুবিন” নামের একটি উপাদান স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এর ফলে চোখ, ত্বক এবং প্রস্রাবের রং হলুদ হয়ে যায়।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে জন্ডিস একটি সাধারণ স্বাস্থ্যসমস্যা। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এ রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে পানিবাহিত ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে।
আমাদের দেহে পুরনো লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে গেলে হিমোগ্লোবিন থেকে বিলিরুবিন তৈরি হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় এই বিলিরুবিন লিভারে গিয়ে প্রক্রিয়াজাত হয় এবং পিত্তরসের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু যদি লিভারে সমস্যা হয়, বা পিত্তরসের পথ বন্ধ হয়ে যায়, অথবা অতিরিক্ত লোহিত কণিকা ভেঙে যায় — তখন রক্তে বিলিরুবিন জমে যায় এবং জন্ডিস দেখা দেয়।
1. ভাইরাল হেপাটাইটিস:
2. লিভার সিরোসিস:
দীর্ঘদিন অ্যালকোহল পান, হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণ বা ফ্যাটি লিভারের কারণে লিভার কোষ ধ্বংস হলে জন্ডিস দেখা দিতে পারে।
3. হিমোলাইটিক অ্যানেমিয়া (যেমন থ্যালাসেমিয়া):
অতিরিক্ত রক্তকণিকা ভাঙলে রক্তে বিলিরুবিন জমে যায়।
4. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া:
কিছু ওষুধ যেমন প্যারাসিটামল ও স্থানীয় ভেষজ ওষুধ লিভারে ক্ষতি করতে পারে।
5. জেনেটিক রোগ:
উইলসন ডিজিজের মতো কিছু বংশগত অসুখ লিভারের বিলিরুবিন বিপাকে বাধা সৃষ্টি করে।
6. পিত্তনালির পাথর ও টিউমার:
পিত্তনালিতে পাথর বা ক্যানসার হলে পিত্তরস জমে যায় এবং জন্ডিস দেখা দেয়।
7. নবজাতকের জন্ডিস:
নবজাতকের লিভার সম্পূর্ণ পরিপক্ক না হওয়ায় অনেক সময় জন্মের কয়েকদিন পর জন্ডিস হয়।
জন্ডিসের চিকিৎসা নির্ভর করে মূল কারণের উপর।
1. ভাইরাল হেপাটাইটিস (A ও E):
সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়। বিশ্রাম, হালকা খাবার, প্রচুর তরল পানীয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শে সহায়ক চিকিৎসা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
2. হেপাটাইটিস B ও C:
চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ প্রয়োজন। নিয়মিত ফলোআপ জরুরি।
3. লিভার সিরোসিস:
এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী জটিল রোগ। খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, অ্যালকোহল বর্জন, প্রয়োজনে লিভার প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হতে পারে।
4. পিত্তনালির পাথর বা টিউমার:
অস্ত্রোপচার বা এন্ডোস্কোপিক চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
5. নবজাতকের জন্ডিস:
প্রয়োজনে ফোটোথেরাপি বা রক্ত পরিবর্তন করা হয়।
সতর্কতা:
হারবাল বা অজানা ভেষজ ওষুধ, কবিরাজি ঝাড়ফুঁক — এসব সম্পূর্ণ পরিহার করুন। এগুলো লিভারের ক্ষতি আরও বাড়াতে পারে।
1. বিশুদ্ধ পানি পান করুন
2. খাবার ঢেকে রাখুন ও বাইরে খাওয়া পরিহার করুন
3. হেপাটাইটিস বি টিকা নিন
4. ব্লেড, ইনজেকশন বা সিরিঞ্জ কখনো শেয়ার করবেন না
5. মদপান থেকে বিরত থাকুন
6. নিয়মিত লিভার ফাংশন টেস্ট করুন যদি পরিবারের কারো লিভার সমস্যা থাকে
7. স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
Mayo Clinic: https://www.mayoclinic.org/diseases-conditions/jaundice
WebMD: https://www.webmd.com/digestive-disorders/jaundice
NIH: https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK544246/
জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ