বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য ও রাজনীতির এক অনন্য মিলনস্থল ছিল পিংনা ইউনিয়নের পিংনা রসপাল জামে মসজিদ। একসময় এটি শুধু একটি ইবাদতখানা ছিল না; বরং ছিল ইতিহাসের জীবন্ত দলিল, সাহিত্য সৃষ্টির নীরব সহযাত্রী এবং বহু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের পদচারণায় মুখরিত এক অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন।
অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই মসজিদে আগমন করেছিলেন। তাঁদের উপস্থিতি মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে। এছাড়া বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ পিংনা উচ্চবিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সময় এই মসজিদে নামাজ আদায় করেন এবং এর প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর ভূয়সী প্রশংসা করেন—যা স্থানীয় জনপদে আজও স্মৃতিচারণের অংশ হয়ে আছে।
একসময় সমগ্র জেলায় পিংনা রসপাল জামে মসজিদটিই ছিল সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য নিদর্শন। ব্রিটিশ শাসনামল এবং পরবর্তী পাকিস্তান আমলে বহু খ্যাতিমান ব্যক্তি এখানে নামাজ আদায় করেছেন। ঐতিহ্যবাহী নকশা, প্রশস্ত বারান্দা ও শান্ত পরিবেশ মসজিদটিকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম খ্যাতিমান কবি কায়কোবাদ পিংনা ইউনিয়নে পোস্টমাস্টার হিসেবে কর্মরত থাকাকালে নিয়মিত এই মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। তাঁর সাহিত্যিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে এই মসজিদকেন্দ্রিক পরিবেশে। মসজিদের সুমধুর আজানের ধ্বনি শুনে তিনি এর বারান্দায় বসেই রচনা করেন তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘আজান’, যা বাংলা ইসলামী সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন।
শুধু তাই নয়, কবি কায়কোবাদের অমর কাব্যগ্রন্থ ‘মহাশ্মশান’-এর অধিকাংশ কবিতাও তিনি অবসর সময়ে এই মসজিদের পরিবেশে বসেই রচনা করেছিলেন। এই মসজিদ তাই কবির সাহিত্য সাধনার এক নীরব সঙ্গী ছিল—যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও অবর্ণনীয়।
মুসল্লিদের গোসল ও অজুর সুবিধার্থে ১৯৩৫ সালে মসজিদের দক্ষিণ পাশে একটি বিশাল পুকুর নির্মাণ করা হয়। সময়ের প্রবাহে বর্তমানে সেই পুকুরটিই কবি কায়কোবাদের স্মৃতির একমাত্র দৃশ্যমান নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অতিমাত্রায় পুরোনো হয়ে যাওয়ায় মসজিদের পলেস্তারা খসে পড়তে শুরু করে। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এলাকাবাসীর সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ঐতিহাসিক মসজিদটি ভেঙে তার পাশে একটি নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এর ফলে কবি কায়কোবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মসজিদ ও তৎকালীন পোস্ট অফিসের কোনো স্মৃতিচিহ্নই আর অক্ষত থাকেনি।
আধুনিক নির্মাণের ছোঁয়ায় হারিয়ে গেছে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। আজ স্থানীয় নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না—এই এলাকায় একসময় কবি কায়কোবাদ নামে একজন বিখ্যাত কবি বসবাস ও সাহিত্যচর্চা করেছিলেন। এমন বিস্মৃতি জাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
বর্তমান প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে জরুরি ভিত্তিতে এখানে কবি কায়কোবাদের নামফলক, স্মারক ফলক ও তথ্যভিত্তিক স্মৃতিচিহ্ন পুনঃস্থাপন করা প্রয়োজন। পিংনা রসপাল জামে মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা ছিল না; এটি ছিল ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রেফারেন্স / সূত্র