বাংলাদেশে কামরাঙা বা স্টারফ্রুট একটি জনপ্রিয় ফল। এর টক-মিষ্টি স্বাদ, ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণের কারণে অনেকেই এটি নিয়মিত খেয়ে থাকেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষণায় দেখা গেছে, কামরাঙা অতিরিক্ত খাওয়া কিডনি রোগীদের জন্য মারাত্মক হতে পারে— এমনকি কিডনি পুরোপুরি অকেজো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাহলে কি সবাই কামরাঙা খাওয়া বন্ধ করবে? না, বিষয়টি এরচেয়ে বেশি বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবসম্মত। চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
—
কামরাঙা বা Averrhoa carambola একটি ট্রপিক্যাল ফল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বাংলাদেশ, ভারত ও মালয়েশিয়ায় ব্যাপকভাবে জন্মে। প্রতি ১০০ গ্রাম কামরাঙায় থাকে—
উপকারিতা:
তবে সব ভালো কিছুর মতো, কামরাঙারও একটি “ডার্ক সাইড” রয়েছে— বিশেষ করে কিডনি রোগীদের জন্য।
—
কামরাঙায় একটি প্রাকৃতিক টক্সিন আছে, যার নাম Caramboxin (কারামবক্সিন)। এটি একটি নিউরোটক্সিক অ্যামিনো অ্যাসিড, যা মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে ক্ষতি করতে পারে, বিশেষ করে যখন কিডনি তা শরীর থেকে বের করে দিতে পারে না।
১. কিডনির কাজের সাথে সম্পর্ক
কিডনি আমাদের শরীরের ফিল্টার সিস্টেম— রক্ত থেকে টক্সিন ও বর্জ্য পদার্থ বের করে দেয়। কিন্তু যদি কারও কিডনি দুর্বল হয় বা “Chronic Kidney Disease (CKD)” থাকে, তবে এই টক্সিন শরীরে জমে যায়। তখন কামরাঙায় থাকা কারামবক্সিন রক্তে থেকে মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে, যার ফলে দেখা দেয়—
২. গবেষণা প্রমাণ:
২০১৩ সালে Clinical Toxicology Journal-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, কিডনি রোগীদের মধ্যে মাত্র ১-২ টি কামরাঙা খাওয়ার পরও নিউরোটক্সিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
একইভাবে, Brazilian Journal of Nephrology (2014) রিপোর্ট করে যে, কামরাঙা খাওয়ার পর ৩ ঘণ্টার মধ্যে খিঁচুনি, কথা জড়িয়ে যাওয়া ও চেতনা হারানোর ঘটনা ঘটে কিডনি রোগীদের মধ্যে।
—
না, সাধারণত নয়।
যাদের কিডনি একদম সুস্থ, তারা মাঝেমধ্যে সীমিত পরিমাণে কামরাঙা খেলে কোনো ক্ষতি হয় না।
তবে—
তখনও শরীরে টক্সিনের প্রভাব পড়তে পারে, কারণ কারামবক্সিনের প্রাকৃতিক নিঃসরণ ধীর হয়ে যায়।
—
ক্ষতিকর প্রভাব বর্ণনা
নিউরোটক্সিসিটি কামরাঙায় থাকা কারামবক্সিন মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে খিঁচুনি ও কোমা ঘটাতে পারে।
বমি ও বমিভাব টক্সিন শরীরে জমে গেলে বমি বমি ভাব, পেট ব্যথা ও হজম সমস্যা হয়।
রক্তচাপের পরিবর্তন অতিরিক্ত পটাশিয়াম কিডনি রোগীদের রক্তচাপ ও হার্টবিটে সমস্যা তৈরি করে।
কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়া দীর্ঘদিন খেলে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) আরও খারাপ হতে পারে।
—
১. যদি কিডনি রোগ থাকে:
২. যদি কিডনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়:
—
ডায়াবেটিক কিডনি রোগী, হাইপারটেনশন রোগী, বা ডায়ালাইসিসে থাকা রোগীদের জন্য কামরাঙা একেবারেই নিষিদ্ধ।
শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণেও প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
যদি কামরাঙা খাওয়ার পর বমি, বিভ্রান্তি বা খিঁচুনি দেখা দেয়, তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
—
যাদের কিডনি সমস্যা আছে, তারা নিচের ফলগুলো সীমিত পরিমাণে খেতে পারেন—
—
গবেষণা সূত্র / রেফারেন্স:
1. Neto MM et al., “Star fruit intoxication: An update”, Clin Exp Nephrol, 2017.
2. Chen CL et al., “Star fruit intoxication in patients with renal failure: Clinical experience and review”, QJM: An International Journal of Medicine, 2001.
3. Martin LC, et al., “Neurotoxic effects of caramboxin in chronic kidney disease patients”, Brazilian Journal of Nephrology, 2014.
4. National Kidney Foundation. “Foods to avoid in kidney disease”. (https://www.kidney.org)
5. U.S. National Library of Medicine – PubMed Articles on Averrhoa carambola toxicity.
কামরাঙা একটি পুষ্টিকর ফল হলেও এটি কিডনি রোগীদের জন্য “বিষের মতো” হতে পারে। কারামবক্সিন নামের টক্সিনটি কিডনি দুর্বল হলে শরীর থেকে বের হয় না এবং নিউরোলজিক্যাল সমস্যার সৃষ্টি করে। তাই যারা কিডনি রোগে ভুগছেন, তাদের এই ফল সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা উচিত। তবে সুস্থ মানুষরা পরিমিত পরিমাণে খেলে উপকারই পেতে পারেন।
মূল বার্তা: