মাওনা ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের করুণ বাস্তবতা: ওষুধ নেই, ডাক্তার নেই—একাই সব সামলাচ্ছেন তিনি
১৯ নভেম্বর ২০২৫ | Natural Medical (naturalmedical.health)
গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়ন। এখানে অর্ধশতাব্দী আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মাওনা ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল—জনগণকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান ও সাধারণ চিকিৎসা সেবা দেওয়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই লক্ষ্য হারিয়ে গেছে। এখন এটি কেবল নামমাত্র একটি ভবন, যেখানে বাস্তবে নেই চিকিৎসা, নেই ওষুধ, নেই ডাক্তার; বরং পুরো স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালাচ্ছেন একজন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (এসএসিএমও)—জান ও মনোবল নিয়ে।
২৫ বছরের পোশাক শ্রমিক ফজলে রাব্বী ঠান্ডাজ্বরে কাঁপছিলেন। ওষুধ কিনতে যথেষ্ট টাকা না থাকায় তিনি ভাড়া বাসার কাছে এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান বিনামূল্যের ওষুধ নিতে। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান—“ওষুধ নেই।” হতাশ হয়ে তাকে ফিরে আসতে হয়। কিছুক্ষণ পর সাহাব উদ্দিন নামে আরেক রোগী এলেন; তাকেও একই হতাশা নিয়ে ফিরে যেতে হয়।
এ দৃশ্য নতুন নয়। প্রতিদিনই বহু মানুষ অপূর্ণ সেবা নিয়ে ফিরে যান।
এসএসিএমও মোশারফ হোসেন, যিনি একাই কেন্দ্রটি পরিচালনা করেন তিনি জানান—
ওষুধের বার্ষিক বাজেট মাত্র ৪ লাখ টাকা
বছরে গড়ে রোগী আসেন ৪২ হাজার জন
সেই হিসাবে প্রতি রোগীর জন্য বাজেট মাত্র ৯.৫০ টাকা
ফার্মাসিস্ট আনোয়ার হোসেন জানান—
অক্টোবর মাসেই খাতায় ২,৭৭৭ রোগীর নাম লেখা রয়েছে
কিন্তু বাস্তবে রোগীদের চাহিদার তুলনায় ওষুধ না থাকায় কাউকে পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি
সর্বশেষ ওষুধ এসেছে গত আগস্টের ৭ তারিখে
স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্রে এ ধরনের সংকট দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর, তার স্পষ্ট প্রমাণ।
উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন এমবিবিএস ডাক্তার থাকার কথা। কিন্তু ৬ বছর ধরে পদটি শূন্য।
অপরদিকে—
আয়াবৃন্দ
পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার পদ শূন্য শূন্য
এসএসিএমও মোশারফ হোসেন বলেন—
“ঝাড়ু দেওয়া থেকে শুরু করে প্রেসক্রিপশন লেখা—সব আমাকে করতেই হয়। পরিবার নিয়ে উপরের তলায় থাকি, কারণ নিরাপত্তারও অভাব রয়েছে।”
ভবনের অবস্থা—
যদিও তিনি দাবি করেন, “এখন আর মাদকসেবীরা আসে না”, স্থানীয়রা বলছে—
“মানুষ না থাকায় সন্ধ্যার পর এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিরাপদ নয়।”
যে সেবাগুলো থাকার কথা—
কিন্তু বর্তমানে এগুলোর বেশিরভাগই বন্ধ। অন্য ইউনিয়নের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা সপ্তাহে একদিন দায়িত্ব পান, কিন্তু তিনি অনেক সপ্তাহেই আসেন না।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাদিয়া ফারুক বলেন—
“দুইটি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় সেবা ব্যাহত হওয়াই স্বাভাবিক। আমরা দীর্ঘদিন ধরে জনবল চেয়ে আবেদন করে যাচ্ছি।”
বাংলাদেশে বর্তমানে—
এসব কারণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়া স্বাভাবিক।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—
১. এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগ
২. ওষুধ সরবরাহ বাড়ানো ও মাসিক পর্যবেক্ষণ
৩. জনবল পূরণ (পরিদর্শিকা, আয়া, ঝাড়ুদার, সাপোর্ট স্টাফ)
৪. ভবন সংস্কার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো
৫. জনগণকে সম্পৃক্ত করে স্থানীয় কমিটি গঠন
৬. ডিজিটাল মনিটরিং
৭. বাজেট পুনর্বিন্যাস—রোগী সংখ্যার ভিত্তিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি
মাওনা ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র বাংলাদেশের উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সামগ্রিক সমস্যারই প্রতিচ্ছবি। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার, কিন্তু হাজার হাজার মানুষ সেই সেবার আওতায় আসতে পারছে না।
অপর্যাপ্ত বাজেট, জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষ তদারকি দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত দুর্বল করে তুলছে।
রেফারেন্স / সূত্রঃ
১. মাঠপর্যায়ের তথ্য
২. এসএসিএমও মোশারফ হোসেনের সাক্ষাৎকার
৩. ফার্মাসিস্ট আনোয়ার হোসেন (মাওনা ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র)
৪. স্থানীয় জনসাধারণের বিবরণ
৫. উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম
৬. বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর—গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিবেদন ২০২৪
৭. Natural Medical ফিল্ড রিপোর্ট