বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় MBBS চিকিৎসক এবং DMF (Diploma in Medical Faculty) চিকিৎসক — এই দুই পেশাজীবী শ্রেণি দেশের স্বাস্থ্যসেবার দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। একজন কাজ করেন প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে, অন্যজন উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রদানে ভূমিকা রাখেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই দুই শ্রেণির মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিভেদ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করার একটি অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী।
আমিনুল ইসলাম বিপ্লব, একজন DMF চিকিৎসক হিসেবে স্পষ্টভাবে বলেন —
“আমাদের গড়ে তোলার পেছনে অসংখ্য MBBS শিক্ষক ও চিকিৎসকের অবদান রয়েছে। তাঁরা আমাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, শিখিয়েছেন, ব্যবহারিকভাবে গড়ে তুলেছেন।”
বাংলাদেশে হাজার হাজার DMF চিকিৎসক MBBS শিক্ষকদের নির্দেশনা ও সহায়তায় দক্ষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবক হিসেবে গড়ে উঠেছেন। তাই MBBS শিক্ষকদের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা অনন্তকাল অবধি থাকবে।
দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, শহরভিত্তিক কিছু চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীকে ভুলভাবে বোঝানো হচ্ছে— “DMF চিকিৎসকরাই নাকি তোমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী।”
তাদের বলা হচ্ছে, “DMF থাকলে চাকরির সুযোগ কমে যাবে, রোগী পাবে না।”
এই ধরনের ভুল ধারণা সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করছে। এর ফলে কিছু চিকিৎসক এমনকি DMF চিকিৎসকদের নিয়োগে বাধা, কর্মবিরতি, রেজিস্ট্রেশন বন্ধের আন্দোলনেও জড়িয়ে পড়ছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো— এসব বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ডে আসলে কার উপকার হচ্ছে? জনগণের, নাকি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর?
- DMF কোর্সের মেয়াদ: ৪ বছর
- MBBS কোর্সের মেয়াদ: ৫-৬ বছর
DMF চিকিৎসকগণ সার্জন, মেডিকেল অফিসার বা কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন না।
তাঁরা মূলত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, রোগ শনাক্তকরণ, প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজন অনুযায়ী রেফারেল ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করেন।
অন্যদিকে MBBS চিকিৎসকগণ উন্নত, সার্জিক্যাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রদান করেন।
তাহলে যেখানে কাজের ক্ষেত্র ও যোগ্যতা স্পষ্টভাবে আলাদা — সেখানে প্রতিযোগিতা কেন?
একজন সাধারণ মানুষ যদি হালকা জ্বর, কাশি বা সামান্য অসুস্থতা নিয়ে ১০০ টাকায় DMF চিকিৎসকের কাছে যায় — তাতে ক্ষতি কোথায়?
MBBS চিকিৎসক তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে উচ্চতর চিকিৎসা দিতে পারেন। কিন্তু সকলের আর্থিক সামর্থ্য এক নয়।
তাহলে কি সাধারণ মানুষকে বাধ্য করা হবে— সামান্য জ্বরের জন্য ৫০০ টাকা ব্যয় করে শহরে MBBS চিকিৎসকের কাছে যেতে?
এই প্রশ্ন এখন সাধারণ জনগণেরও।
যদি কেউ দাবি করেন যে শুধুমাত্র MBBS চিকিৎসকরাই প্রেসক্রিপশন দিতে পারবেন, তবে আগে কিছু বিষয় নিশ্চিত করা দরকার —
1. দেশের প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নে পর্যাপ্ত সংখ্যক MBBS চিকিৎসক কর্মরত থাকতে হবে।
2. ওয়ার্ডবয় বা অযোগ্য কর্মীর মাধ্যমে কোনো সার্জারি চলবে না।
3. ২৪ ঘণ্টা রেসিডেন্ট সার্জন ও ফিজিশিয়ান উপস্থিত রাখতে হবে।
4. প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
5. উপজেলা পর্যায় থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন বা প্রেষণে যারা শহরে যান, তাঁদের স্থলে নতুন MBBS চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে।
এসব বাস্তবায়ন না করে যদি DMF চিকিৎসকদের কাজ বাধাগ্রস্ত করা হয়, তবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়বে।
DMF প্রোগ্রামটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত একটি বৈধ শিক্ষা কর্মসূচি।
এটি বাংলাদেশের প্রাথমিক ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।
DMF চিকিৎসকদের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লাখো মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা পায় এবং দ্রুত রেফারেল সুবিধা গ্রহণ করতে পারে।
অতএব, এই পেশাকে অবমূল্যায়ন করা মানে হলো— প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য অধিকারকে অস্বীকার করা।
স্বাস্থ্যসেবা হলো মানবাধিকার।
একটি বৈধ, প্রশিক্ষিত ও রাষ্ট্র অনুমোদিত পেশাকে হেয় করা মানে জাতির স্বাস্থ্যের ভিত্তিকে দুর্বল করা।
জনস্বার্থকে পেশাগত স্বার্থের কাছে ত্যাগ করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
“একটি বৈধ প্রফেশনকে অপমান করবেন না,
আল্লাহ তা সহ্য করবেন না।”
লেখক:
আমিনুল ইসলাম বিপ্লব
সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সিনিয়র সমন্বয়ক,
সাধারণ ম্যাটস শিক্ষার্থী ঐক্য পরিষদ