বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাসে “মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট” পেশাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ম্যাটস (MATS) থেকে পাশ করা মেডিকেল এসিস্ট্যান্টরা প্রাথমিক ও মধ্যম পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় বহু বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। একসময় সরকারী চাকরিতেও তাদের জন্য “মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট” নামে একটি পদ ছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই পদটির নামকরণ হয় “সাব এসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (Sub Assistant Community Medical Officer – SACMO)”।
১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে “মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট” নামে পদ ছিল। পরবর্তীতে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতাধীন পদগুলোর নাম পরিবর্তিত হয়ে “সাব এসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (SACMO)” হয়।
এই পরিবর্তনের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও একই নাম গ্রহণ করা হয়। ফলে, মেডিকেল এসিস্ট্যান্টরা সরকারের অধীনস্থ স্বাস্থ্যখাতে নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করে।
তবে, এদের পদ “ব্লক পোস্ট” হিসেবে চিহ্নিত — অর্থাৎ, বেতন স্কেল বৃদ্ধি পেলেও পদোন্নতির সুযোগ সীমিত, ডেজিগনেশন পরিবর্তনের সুযোগও নেই।
বর্তমানে তারা মূলত ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পর্যন্ত সেবা প্রদান করে আসছেন।
ম্যাটস থেকে চার বছরের কোর্স সম্পন্ন করার পর মেডিকেল এসিস্ট্যান্টদের এক বছর ইন্টার্নশিপ করতে হয়। ইন্টার্নশিপ শেষে তারা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC)-এ নিবন্ধিত হন।
এই নিবন্ধন তাদের বৈধভাবে মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজের অনুমতি দেয়। তবে, তারা নামের আগে “ডাক্তার” শব্দটি ব্যবহার করতে পারেন না — এটি BMDC-এর স্পষ্ট নীতিমালায় উল্লেখিত এবং পরবর্তীতে সর্বোচ্চ আদালতের রায় দ্বারাও তা পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে।
BMDC নীতিমালা অনুযায়ী, শুধুমাত্র MBBS ও BDS ডিগ্রিধারীরা নামের আগে “ডাক্তার” লিখতে পারবেন।
অন্য কোনো চিকিৎসা পেশাজীবী, যেমন মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, টেকনোলজিস্ট, নার্স বা প্যারামেডিক — কেউই “ডাক্তার” শব্দটি ব্যবহার করতে পারবে না।
এটি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত মানদণ্ড।
দুর্ভাগ্যবশত, দেশের গ্রামীণ এলাকায় এখনো কিছু ব্যক্তি নিজেদের নামের আগে “ডাক্তার” লিখে প্রেসক্রিপশন দেন। এটি BMDC এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রতিটি জেলা ও উপজেলার স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তারা এসব আইনভঙ্গের ঘটনা মনিটর করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্বে রয়েছেন। কেউ তা করতে ব্যর্থ হলে দায়িত্বভার তাদের ওপর বর্তাবে।
বাংলাদেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে চিকিৎসা বিষয়ে আগ্রহ ও প্রয়াস ব্যাপক। এখানে বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবচসহ নানা রকম ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ব্যবস্থা বিরাজমান।
ফলে দেশে “হোমিও ডাক্তার”, “হারবাল ডাক্তার”, এমনকি “কানের ডাক্তার” নামে বহু মানুষ চিকিৎসা দিচ্ছেন।
অনেকে ১৫ দিন থেকে তিন মাসের কোয়াক ট্রেনিং নিয়ে অনুমোদনহীন দোকান খুলে বসে আছেন।
অনেকে প্রেসক্রিপশন প্যাডে “ডা.” লিখে চিকিৎসা প্রদান করছেন — যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো MBBS চিকিৎসক ও মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট/SACMO-দের মধ্যকার পেশাগত দ্বন্দ্ব।
অনেক চিকিৎসক মনে করেন, SACMO-রা প্রাইভেট প্র্যাকটিস বা চিকিৎসা সেবায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কিন্তু বাস্তবে, মেডিকেল এসিস্ট্যান্টরা প্রাথমিক স্তরের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের সহযোগী হিসেবেই কাজ করেন।
ডাঃ সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী, উপপরিচালক (হাসপাতাল-১), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন —
“একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দ্বারা আবদ্ধ নিজেদের কাজে সহযোগিতাকারী মেডিকেল এসিস্ট্যান্টদের নিয়ে কিছু চিকিৎসক কেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন? কেন তাদের বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করেন?”
তিনি আরও বলেন —
“স্বাস্থ্য বিভাগের অন্য গ্রুপ যেমন নার্স, টেকনোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট — তাদের অনেকেই প্র্যাকটিস করে। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে কোনো আপত্তি দেখা যায় না। তাহলে মেডিকেল এসিস্ট্যান্টদের ক্ষেত্রে এত গাত্রদাহ কেন?”
ডাঃ শাফীর মতে, যারা মেডিকেল এসিস্ট্যান্টদের বিরুদ্ধে অযাচিত মন্তব্য বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি করে, তারা হয়তো জাতীয়তাবাদবিরোধী বা নিজেদের অদক্ষতার আড়াল করতে চায়।
তিনি বলেন —
“যাদের নিজেদের চিকিৎসা দক্ষতায় আস্থা নেই, তারাই অধঃস্তনদের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে।”
তিনি ডিপ্লোমা মেডিকেল এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (DMAB)-এর কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে বলেন —
“জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার প্রতিটি পদক্ষেপে মেডিকেল এসিস্ট্যান্টরা সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে—এই প্রত্যাশা করছি।”
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট বা SACMO-দের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। তারা চিকিৎসকদের সহযোগী এবং জনগণের সবচেয়ে কাছের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী।
তাদের শিক্ষাগত মান, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
চিকিৎসক ও মেডিকেল এসিস্ট্যান্টদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্য থাকলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত আরও শক্তিশালী হবে, এবং “সবার জন্য স্বাস্থ্য” বাস্তবায়ন সহজতর হবে।
🟩 রেফারেন্স / সূত্রঃ