বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস একটি নীরব মহামারি হিসেবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে পৃথিবীতে ৫৩ কোটি মানুষেরও বেশি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, এবং ২০৪৫ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ৭৮ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের অন্যতম দৈনন্দিন কষ্ট হলো — রক্তে গ্লুকোজ পরিমাপের জন্য প্রতিনিয়ত আঙুলে সুচ ফোটানো। দিনে ৪ থেকে ৮ বার রক্ত পরীক্ষা বহু মানুষের জন্য যন্ত্রণাদায়ক, মানসিকভাবে বিরক্তিকর এবং অনেক ক্ষেত্রে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে চিকিৎসকের নির্দেশাবলী মানার ক্ষেত্রে অসচেতনতা দেখা দেয়, যার পরিণতি হতে পারে জীবনহানিকর জটিলতা।
এই বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করেই যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) উদ্ভাবন করেছে ডায়াবেটিস গবেষণার ইতিহাসে এক অত্যাধুনিক, যুগান্তকারী প্রযুক্তি — সুচবিহীন (Non-Invasive), আলোভিত্তিক গ্লুকোজ মনিটরিং ডিভাইস, যা মাত্র হাত রাখলেই ৩০ সেকেন্ডে রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা জানাতে পারে। কোনো রক্ত নিতে হবে না, ব্যথা নেই, নেই প্রতিদিনের ভয় ও অস্বস্তি।
এই গবেষণার বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘Analytical Chemistry’–এ।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই যন্ত্রে ব্যবহার করা হয়েছে রামান স্পেকট্রোস্কোপি, যা বিভিন্ন অণুর আলো বিচ্ছুরণের ধরন বিশ্লেষণ করে তাদের সনাক্ত করতে সক্ষম। গ্লুকোজ অণুর নির্দিষ্ট স্পেকট্রাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট থাকে। ত্বকের ওপর কাছাকাছি-ইনফ্রারেড (Near-Infrared) এবং দৃশ্যমান আলো ফেলে সেই প্রতিফলিত রামান সংকেত বিশ্লেষণ করেই গ্লুকোজ শনাক্ত করা হয়।
এমআইটির গবেষক জেওন উওং ক্যাং বলেন—
“প্রতিদিন আঙুলে সুচ ফোটানো রোগীদের জন্য একটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। অনেকে এ কারণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরীক্ষা করেন না। এই প্রযুক্তি সেই কষ্ট কমিয়ে এনে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করবে।”
২০১০ সালে এমআইটির লেজার বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানীরা প্রথম প্রমাণ করেন যে রামান স্পেকট্রোস্কোপি দিয়েও রক্তে গ্লুকোজ মাপা সম্ভব। কিন্তু তখন যন্ত্রটি ছিল বড়, দামি এবং বহনযোগ্য ছিল না। পরে দীর্ঘ ১০ বছরের গবেষণায় তারা ডিভাইসটিকে ছোট এবং নির্ভুল করার দিকে মনোনিবেশ করেন।
২০২০ সালে গবেষক দল নতুন একটি কৌশল উদ্ভাবন করে, যেখানে ভিন্ন কোণ থেকে আসা কাছাকাছি-ইনফ্রারেড আলো ও রামান সংকেত একত্র করে গ্লুকোজ ছাড়া অন্য ত্বকের অণুর সংকেত ফিল্টার করে আরও নির্ভুল ফলাফল পাওয়া যায়। এই নির্ভুলতার উন্নতিই প্রযুক্তিটিকে বাজারযোগ্য করেছে।
প্রথম দিকে যন্ত্রটি ছিল একটি ডেস্কটপ প্রিন্টারের আকারের। এখন সেটি কমিয়ে আনা হয়েছে জুতার বাক্সের সমান। এটি সহজে বহনযোগ্য, ব্যবহারবান্ধব এবং ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই ফলাফল দেয়।
গবেষক আরিয়ানা ব্রেসি বলেন—
“আমরা আগে বহু ব্যান্ডের সংকেত বিশ্লেষণ করতাম। এখন মাত্র তিনটি মূল ব্যান্ডে মনোযোগ দিতে হয়। এতে যন্ত্র দ্রুত ও নির্ভুলভাবে ফল দিতে সক্ষম হয়।”
বিশ্বে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ সুচ ফোঁড়ার কারণে মানসিক চাপ, যন্ত্রণা ও অস্বস্তিতে ভোগেন। এই নতুন ডিভাইস ব্যবহার করলে—
বিশ্বব্যাপী হেলথ টেকনোলজিতে এই উদ্ভাবন নতুন দিগন্ত খুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।