পিরানহা মাছ খাওয়া: সত্য, মিথ ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি
বাংলাদেশে পিরানহা মাছ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। কেউ কেউ একে “মানুষখেকো মাছ” বলে ভয় পান, আবার কেউ বলেন এটি প্রোটিনসমৃদ্ধ মাছ। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো — পিরানহা মাছ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ, এবং এটি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও আইনি অপরাধ। এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হলো পিরানহার প্রকৃতি, পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্যের ঝুঁকি ও সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণ।
পিরানহা হলো দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদী অববাহিকায় পাওয়া এক প্রজাতির মাংসাশী মাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Pygocentrus nattereri। এটি ছোট আকারের হলেও অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দাঁতের জন্য পরিচিত। সাধারণত ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং রক্তের গন্ধ পেলে দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করে। আমাজনের নদীগুলিতে এরা খাদ্যচক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বিদেশি দেশে এটি আক্রমণাত্মক প্রজাতি (Invasive Species) হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশ সরকার ২০০৮ সাল থেকে “মৎস্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা আইন, ১৯৫০” অনুযায়ী পিরানহা মাছ চাষ, বিক্রয়, আমদানি ও সংরক্ষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
এই নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ হলো—
ফলে বাংলাদেশে এই মাছ চাষ বা বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পিরানহা মাছ সরাসরি বিষাক্ত নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে এটি অবৈধভাবে চাষ হয়, সেসব মাছ খেলে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
১. দূষিত পরিবেশে বেড়ে ওঠা
পিরানহা সাধারণত মৃত প্রাণী ও পচা পদার্থ খায়। ফলে এর শরীরে ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও টক্সিন জমে যায়। এই মাছ খেলে ফুড পয়জনিং, অন্ত্রের সংক্রমণ, জ্বর ও গ্যাস্ট্রিক সমস্যা হতে পারে।
২. ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী সংক্রমণ
WHO ও FAO-এর গবেষণা অনুযায়ী, বন্য মাংসাশী মাছের দেহে Vibrio, Aeromonas, Pseudomonas জাতীয় জীবাণু থাকে।
যদি মাছটি ভালোভাবে রান্না না হয়, তবে এই জীবাণুগুলো মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রক্ত সংক্রমণ, চর্মরোগ বা অন্ত্রজনিত অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে।
৩. ভারী ধাতু ও বিষাক্ত উপাদান
দূষিত পানিতে বেড়ে ওঠা মাছের দেহে সীসা (lead), আর্সেনিক, পারদ (mercury) জাতীয় ভারী ধাতু জমা হয়। এসব উপাদান দীর্ঘমেয়াদে লিভার, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।
৪. পুষ্টিগত বিভ্রান্তি
যদিও পিরানহা মাছ প্রোটিনে সমৃদ্ধ, তবুও এটি মানুষের জন্য নিরাপদ নয়। কারণ এটি অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠে, এবং পরিচালনাগত মান নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে।
আইনি ও সামাজিক ঝুঁকি
বাংলাদেশে নিষিদ্ধ মাছ খাওয়া বা বিক্রি করা “Fish Conservation and Management Act”-এর আওতায় অপরাধ। এতে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া নিষিদ্ধ মাছ খাওয়ার প্রচলন সামাজিকভাবে পরিবেশবিরোধী আচরণ হিসেবে গণ্য হয়।
পিরানহার মতো উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ কিন্তু নিরাপদ বিকল্প হিসেবে নিম্নলিখিত মাছগুলো খাওয়া যেতে পারে —
এই মাছগুলো সরকার অনুমোদিত ও পুষ্টিতে সমৃদ্ধ।
দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশ যেমন ব্রাজিল বা পেরুতে পিরানহা সীমিতভাবে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে সেখানে এটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ধরা ও রান্না করা হয়।
তবে FAO সতর্ক করে বলেছে —
“Unregulated consumption of carnivorous fish may expose humans to bacterial and heavy metal contamination.”
অর্থাৎ, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ধরা মাংসাশী মাছ খেলে ব্যাকটেরিয়া ও ভারী ধাতু দ্বারা দূষণের ঝুঁকি থাকে।

বাংলাদেশে পিরানহা মাছ খাওয়া ও চাষ নিষিদ্ধ, এটি পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ( ছবিঃ পিক্সেল ডট কম )
পিরানহা মাছ খাওয়া দেখতে আকর্ষণীয় মনে হলেও, বাস্তবে এটি স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং বাংলাদেশের আইনে নিষিদ্ধ।
তাই এই মাছ খাওয়া বা চাষ উভয়ই পরিহার করা উচিত।
স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় প্রজাতির মাছই শ্রেয়।
রেফারেন্স / সূত্রঃ