ঘুম মানবজীবনের অপরিহার্য অংশ। শরীর, মন ও আত্মার পুনরুজ্জীবনের জন্য ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। ইসলামে ঘুম কেবল শারীরিক বিশ্রাম নয়—বরং তা ইবাদতের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে, যদি তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা অনুযায়ী হয়।
নবীজির (সা.) ঘুমের অভ্যাস ছিল পরিমিত, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও স্বাস্থ্যসম্মত। তাঁর প্রতিটি নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার গভীর রহস্য। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও এই সুন্নাহসমূহের কার্যকারিতা স্বীকার করে।
______________________
চলুন জেনে নিই — স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ঘুমের আগে নবীজির (সা.) ৭টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও তার বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য।
রাসুল (সা.) ঘুমানোর আগে আল্লাহর জিকিরে লিপ্ত থাকতেন। তিনি বলতেন,
“যখন তোমরা বিছানায় যাবে, তখন ডান পাশে শুয়ে বলবে: আল্লাহুম্মা বিস্মিকা আহইয়া ওয়া বিস্মিকা আমুত।”
অর্থ: “হে আল্লাহ! তোমার নামেই আমি জীবিত থাকি এবং তোমার নামেই মৃত্যুবরণ করি।”
— সহিহ বুখারি: ৬৩১২; সহিহ মুসলিম: ২৭১০
এছাড়া নবীজির (সা.) অভ্যাস ছিল ঘুমের আগে সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করা (সহিহ বুখারি: ৫০১৭)।
এই আমলগুলো মনকে শান্ত করে, মানসিক চাপ হ্রাস করে এবং দুষ্ট শক্তির প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেয়।
আধুনিক মনোবিজ্ঞান মতে, ঘুমের আগে দোয়া বা প্রার্থনা করলে কর্টিসল হরমোন কমে, ফলে ঘুম গভীর ও প্রশান্ত হয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন,
“যে ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় ঘুমায়, সে যখন রাতে জেগে আল্লাহর স্মরণ করে ও দোয়া করে, আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন।”
— সহিহ ইবনে মাজাহ: ৩৮৬৪
অজু শরীরকে বিশুদ্ধ করে, ঘুমের আগে মানসিক প্রশান্তি আনে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ঘুমের আগে ঠান্ডা পানি দিয়ে হাত-মুখ ধোয়া শরীরের তাপমাত্রা ভারসাম্য রাখে, যা ঘুমের মান উন্নত করে।
রাসুল (সা.) বলেছিলেন,
“যখন তুমি বিছানায় যাবে, তখন তোমার ডান পাশে শোও।”
— সহিহ বুখারি: ২৪৭; সহিহ মুসলিম: ২৭১০
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, ডান কাতে শোয়ায় হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ কমে, পাকস্থলীর হজম প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে। এভাবে ঘুমানো শরীরকে প্রাকৃতিক বিশ্রামে রাখে।
নবীজির (সা.) নির্দেশ ছিল,
“যখন কেউ শয্যায় যাবে, তখন তার বিছানার চাদর একবার ঝাড়ে নেবে, কারণ সে জানে না, সেখানে কী আছে।”
— সহিহ বুখারি: ৬৩২০
এটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিধি। ধুলো, পোকামাকড় বা জীবাণু থেকে সুরক্ষা পেতে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
আজকের দিনে এটি আধুনিক “স্লিপ হাইজিন”-এর একটি মৌলিক অংশ হিসেবে বিবেচিত।
রাসুল (সা.) কিবলামুখী হয়ে ডান কাতে শুয়ে ঘুমাতেন।
— মুসনাদ আহমাদ: ২৩৮৪৯
তিনি উপুড় হয়ে ঘুমানো অপছন্দ করতেন।
— সুনানে তিরমিজি: ২৭৬৯
উপুড় হয়ে শোয়ায় শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ যেমন হৃদপিণ্ড ও ফুসফুসের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, ফলে ঘুমের মান নষ্ট হয় এবং মেরুদণ্ডে ব্যথা হতে পারে। নবীজির (সা.) শিক্ষা এখানে এক বৈজ্ঞানিক বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।
রাসুল (সা.) বলেছেন,
“যে নিজের নফসের হিসাব করে, সে সফল।”
— মুসনাদ আহমাদ: ২৩৯৮৮
ঘুমানোর আগে দিনের কাজ ও আমল পর্যালোচনা করলে মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি পায়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, দিনের শেষে আত্মমূল্যায়ন “ইমোশনাল ক্লিনজিং” হিসেবে কাজ করে—যা মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় ও ঘুমকে প্রশান্ত করে।
নবীজির (সা.) রাত্রিকালীন রুটিনে ছিল ঘুম ও তাহাজ্জুদের ভারসাম্য।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“তুমি রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদের মাধ্যমে দাঁড়াও।”
— সুরা ইসরা: আয়াত ৭৯
রাতের একাংশে ইবাদত করার মাধ্যমে ঘুমও নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং মানসিক প্রশান্তি বাড়ে।
গবেষণায় দেখা যায়, তাহাজ্জুদের মতো মাঝরাতে অল্প সময় জেগে প্রার্থনা করা মনোযোগ, স্মৃতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ায়।
রাসুল (সা.) বলেছেন,
“তোমরা দিনের কিছু অংশে ঘুমাও, কারণ শয়তান ঘুমায় না।”
— জামে’ আস-সগীর: ৮৫৮৯
দুপুরের সংক্ষিপ্ত ঘুম বা কায়লুলা কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং মানসিক সতেজতা বজায় রাখে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, ১৫-৩০ মিনিটের পাওয়ার ন্যাপ মস্তিষ্ককে রিফ্রেশ করে।
জেগে উঠলে রাসুল (সা.) বলতেন,
“আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বা’দা মা আমাতানা, ও ইলাইহিন নুশূর।”
অর্থ: “সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের মৃত্যুর পর (ঘুম থেকে) জাগিয়ে তুলেছেন; এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন।”
— সহিহ বুখারি: ৬৩১৪
এই দোয়া জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি মানসিক ইতিবাচকতার সূচনা ঘটায়।
________________________________________________
ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা যা ঘুমের মতো সাধারণ কাজকেও ইবাদতের মর্যাদায় উন্নীত করেছে।
নবীজির (সা.) ঘুমের নিয়মাবলি শুধু আত্মিক শান্তি নয়, বরং শারীরিক সুস্থতাও নিশ্চিত করে।
অজু করে ঘুমানো, ডান কাতে শোয়া, দোয়া পাঠ, আত্মসমালোচনা—সব মিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকর জীবনধারা।
নবীজির (সা.) শিক্ষা আমাদের শেখায় — “ঘুমও যেন হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।”
রেফারেন্স/সূত্রঃ
________