গরমের দিনে পিপাসা লাগলে বা অতিরিক্ত ঘাম হলে অনেকেই ওরস্যালাইন বা লবণ-চিনি মেশানো পানি খেয়ে থাকেন। অনেকের বিশ্বাস, এতে শরীর দ্রুত সতেজ হয় এবং ক্লান্তি কমে যায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই অভ্যাস কতটা সঠিক? পিপাসা মেটাতে স্যালাইন খাওয়া আসলেই কি উপকারি, নাকি এর মাধ্যমে শরীরে অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি হয়?
স্যালাইন হলো একধরনের লবণযুক্ত পানি, যেখানে সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) এবং গ্লুকোজ নির্দিষ্ট অনুপাতে মেশানো থাকে। এটি মূলত শরীরের হারানো পানি ও ইলেকট্রোলাইট (যেমন সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্লোরাইড) পূরণের জন্য তৈরি।
যখন উপকার হয়: শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে (যেমন: ডায়রিয়া, বমি, অতিরিক্ত ঘাম)।
যখন ক্ষতি হয়: শরীর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় থাকলে, এবং পিপাসা মেটানোর জন্য অকারণে স্যালাইন খাওয়া হলে।
১. ডিহাইড্রেশন রোধ করে:
অতিরিক্ত ঘাম, বমি বা ডায়রিয়ার সময় শরীর থেকে পানি ও লবণ হারিয়ে যায়। ওরস্যালাইন শরীরের পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
২. ইলেকট্রোলাইট ব্যালান্স পুনরুদ্ধার করে:
স্যালাইন শরীরের কোষে সোডিয়াম ও গ্লুকোজ সরবরাহ করে, যা শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে।
৩. হিট এক্সহস্টশন বা হিটস্ট্রোক প্রতিরোধ করে:
গরমে কাজ করলে মাঝে মাঝে ওরস্যালাইন শরীর ঠান্ডা রাখে ও ক্লান্তি দূর করে।
৪. শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য জীবনরক্ষাকারী:
ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতায় WHO অনুমোদিত ওরস্যালাইন জীবন বাঁচাতে সক্ষম।
১. অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে জমে:
নিয়মিত স্যালাইন খেলে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায়, ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ফোলাভাব, ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
২. কিডনির উপর চাপ বৃদ্ধি পায়:
অতিরিক্ত লবণ কিডনিকে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করে, যা দীর্ঘমেয়াদে কিডনি দুর্বল করতে পারে।
৩. স্বাভাবিক তৃষ্ণা প্রতিক্রিয়া নষ্ট হয়:
শরীর সাধারণত পানির সংকেত দেয়। আপনি যদি সবসময় স্যালাইন খান, তবে শরীরের প্রাকৃতিক হাইড্রেশন সিস্টেম বিঘ্নিত হয়।
৪. শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে সোডিয়াম ইমব্যালান্স:
অতিরিক্ত স্যালাইন খেলে খিঁচুনি, দুর্বলতা ও বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে।
| অবস্থা | স্যালাইন খাওয়ার প্রভাব | ফলাফল |
|---|---|---|
| ডায়রিয়া বা বমি হলে | হারানো পানি ও ইলেকট্রোলাইট দ্রুত পূরণ করে | উপকার বেশি |
| অতিরিক্ত গরমে ঘাম হলে | শরীর ঠান্ডা রাখতে ও শক্তি দেয়, পরিস্থিতি অনুসারে উপকারী হতে পারে | মাঝারি উপকার |
| শুধু পিপাসা মেটাতে খেলে (স্বাভাবিক অবস্থায়) | অপ্রয়োজনীয় সোডিয়াম গ্রহণ; ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য বিঘ্নিত করতে পারে | ক্ষতি বেশি |
| প্রতিদিন অভ্যাস করলে | উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি উপর চাপ, দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা | গুরুতর ক্ষতি |
বিশুদ্ধ পানি মানবদেহের জন্য প্রাকৃতিক ও সবচেয়ে নিরাপদ পানীয়। শুধুমাত্র যখন শরীরে পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দেবে, তখনই ওরস্যালাইন খাওয়া উচিত। পিপাসা মেটাতে প্রতিদিন স্যালাইন খাওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে অপ্রয়োজনীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ।
পিপাসা মেটাতে স্যালাইন পানি খাওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষতি উপকারের তুলনায় বেশি।
শরীর সুস্থ থাকলে বিশুদ্ধ পানি পান করাই সবচেয়ে ভালো।
স্যালাইন হলো “চিকিৎসা সহায়ক তরল”, পানীয় বিকল্প নয়।
রেফারেন্স/সূত্রঃ
১. World Health Organization (WHO) – Oral Rehydration Salts (ORS) Guidelines, 2023
২. UNICEF – Rehydration Therapy Recommendations
৩. Harvard Health Publishing –
“Electrolyte Balance and Hydration”
৪. Mayo Clinic – “Sodium in diet: Use sparingly”