স্বাস্থ্য খাতে সাগরচুরি: কেনা হচ্ছে ৭ লাখ টাকা দামের ১২ হাজার কম্পিউটার, ভ্রমণব্যয় ১২৭ কোটি টাকা
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হওয়া একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদিত প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটি স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের নামে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে প্রকল্পের বাজেটে অস্বাভাবিক ব্যয়, অতিরিক্ত দরপত্র মূল্য, কম্পিউটার কেনায় অস্বাভাবিকতা, এবং কনসালটেন্সি খাতে বহুগুণ বেশি বরাদ্দ—এসব অভিযোগ জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
এটি একটি বহুমাত্রিক জাতীয় প্রকল্প, যার মূল লক্ষ্যসমূহ হলো—
মোট বাজেট: ১৩,০০০ কোটি টাকা
এর মধ্যে—
তবে পরিকল্পনা কমিশনের সাম্প্রতিক বৈঠকে এই প্রকল্পে বরাদ্দকৃত খরচ বিশ্লেষণে বেশ কিছু অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে।
সবচেয়ে আলোচিত অনিয়ম—কম্পিউটারের দাম ৭ লাখ টাকা।
বাংলাদেশের বাজারে সাধারণ এক অফিস ডেক্সটপ (Core i5, 8GB RAM, 512GB SSD) সহজেই ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়।
কিন্তু প্রকল্পে একই স্পেসিফিকেশনের কম্পিউটারের দাম ধরা হয়েছে—
এটি বাজারমূল্যের তুলনায় ১২ গুণ বেশি!
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
“কম্পিউটারের দাম এত বেশি হওয়া স্বাভাবিক নয়। এখানে স্পষ্টভাবেই ওভারপ্রাইসিং বা টেন্ডারে অনিয়মের ইঙ্গিত রয়েছে।”
ওপেন টেন্ডার ও প্রকল্প রিপোর্টে দেখা যায়—
কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ভ্রমণ ব্যয়: ১২৭ কোটি টাকা
এটি প্রকল্পের প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় বহু গুণ বেশি, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজ।
প্রকল্পে আরও আছে—
কনসালটেন্সি / পরামর্শদান ফি: ২১৬ কোটি টাকা
বিশেষজ্ঞদের মতে—
এই পরিমাণ ব্যয় প্রকল্পায়ন ও কারিগরি কাজের তুলনায় অস্বাভাবিক
দেশের স্বাস্থ্যখাতে এখনো মানবসম্পদ সংকট তীব্র
তাহলে এই বিপুল পরিমাণ পরামর্শফি কেন?
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) এক সদস্য বলেন—
“২১৬ কোটি টাকায় কতটা স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন হবে সেটা প্রশ্নের বিষয়। ওই অর্থ দিয়ে ডাক্তার–নার্স নিয়োগ বা যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হলে সেবা আরও কার্যকর হতো।”
অর্থনীতিবিদ ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন—
“স্বাস্থ্য খাতে অর্থের অভাব নেই। কিন্তু অনিয়ম, অদক্ষতা ও দুর্নীতি উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেও একই ধরণের সাগরচুরির অভিযোগ উঠছে, যা উদ্বেগজনক।”
হোয়াইট পেপার (১ ডিসেম্বর)–এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়—
এতে বলা হয়—
“স্বাস্থ্যখাতের প্রকল্পগুলোতে টেন্ডার–কারসাজি, ওভারপ্রাইসিং এবং কৃত্রিম ব্যয় বাড়ানো এখন রীতিমতো সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়—
অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে
অস্বাভাবিক ব্যয় পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের পরও অডিটের জন্য নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র মতে—
১ ডিসেম্বর বৈঠকে ১৮টি প্রকল্প অনুমোদিত
এর মধ্যে স্বাস্থ্যখাতের প্রকল্পটি নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়
বাজেট অডিটের জন্য আলাদা টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব উঠেছে
নেটিজেনদের মন্তব্য—
- “স্বাস্থ্যের নামে লুটপাটের এই চিত্র জাতির জন্য লজ্জাজনক।”
- “অন্তর্বর্তী সরকারও কি একই পথে?”
- “৭ লাখে কম্পিউটার কেনা হচ্ছে—এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
১৩ হাজার কোটি টাকার এ বিশাল প্রকল্পের ব্যয়ে অস্বাভাবিকতা ও দুর্নীতির অভিযোগ স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের অনিয়মকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
—এসব ছাড়া স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এসব প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
রেফারেন্স / সূত্র