রিপোর্ট: স্বাস্থ্য বিভাগ • বিশেষজ্ঞ: ডা. মিশকাত আক্তার
শিশুর প্রথম খাবার হিসেবে মায়ের বুকের দুধ অপরিহার্য। এটি শিশুর পুষ্টি ও রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবু অনেক মা-ই জানেন না, কখন দুধ কম হচ্ছেনা—এটি কী বাস্তব সমস্যা নাকি ভুল ধারণা। এই ফিচারে জানুন কারণ, প্রতিকার এবং কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ছবিঃ বাচ্চাকে মায়ের বুকে দুধ খাওয়ানোর প্রশিক্ষণ
দুধ কম হওয়ার আশঙ্কা—কতটা বাস্তব?
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) ও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করার হার তুলনামূলকভাবে বেশি—তবু অনেক মায়েরাই কয়েক মাসের মধ্যেই বুক খাওয়ানো বন্ধ করেন। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মা-দের ভয়, ভ্রান্ত ধারণা ও সঠিক তথ্যের অভাব। বাংলাদেশেও অনুরূপ চিত্র দেখা যায়।
“অনেক সময় মায়েরা ভুলভাবে মনে করেন যে তাদের দুধ পর্যাপ্ত হচ্ছে না। শিশুর কান্না বা অস্থিরতাকে দুধের ঘাটতি ভাবেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমস্যা নির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তন করলে সমাধান করা যায়” — ডা. মিশকাত আক্তার।
কেন দুধ কমে যায়?
বিশেষজ্ঞরা যে মূল কারণগুলো আরও বেশি দেখতে পান, সেগুলো হলো:
শিশুকে পর্যাপ্ত ঘনত্বে বুক খাওয়ানো না হওয়া
মায়ের মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও শারীরিক ক্লান্তি
পর্যাপ্ত পুষ্টি ও তরল উপাদান গ্রহণ না করা
শিশু ঠিকভাবে স্তন ধরতে না পারা
জন্মের পর শুরুর দিকে ফর্মুলা দুধ ব্যবহার শুরু করলে বায়োলজিক্যালি কম উৎপাদন
দুধ বাড়ানোর কার্যকর উপায়
ঘন ঘন খাওয়ান
প্রয়োগ
দিনে অন্তত ৮–১২ বার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়। শিশুর অনুরোধ অনুযায়ী যতক্ষণ খেতে চায় ততক্ষণ গাইড করে খাওয়ান। চোষার স্টিমুলেসন দুধ উৎপাদন বাড়ায়।
দুধ পাম্পিং
প্রয়োগ
শিশু ঠিকমতো খেতে না পারলে বা বুক অতিরিক্ত ভরে থাকলে পাম্প করে দুধ জমিয়ে রাখুন। পাম্পিং দুধ উৎপাদন চালিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
সুষম খাদ্য
কি খাওয়া যেতে পারে
শাকসবজি: পালং, লাল শাক, লাউ
প্রোটিন: মাছ, মুরগি, ডিম, মাংস
ফলমূল: কমলা, কলা, পেঁপে
ওমেগা-৩: স্যালমন, ফ্ল্যাক্সসিড, আখরোট
আত্মবিশ্বাসভিত্তিক খাবার: মেথি, মৌরি, ওটমিল, রসুন
পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ
প্রয়োগ
মায়ের দুধ প্রায় ৯০% পানি দিয়ে গঠিত—প্রতিদিন অন্তত ৬–৮ গ্লাস পানি/তরল খাওয়ার পরামর্শ। খাওয়ানোর আগে এক গ্লাস পানি নিলে উপকারী হতে পারে।
মানসিক স্বস্তি ও বিশ্রাম
প্রয়োগ
মানসিক চাপ ও ক্লান্তি দুধ উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। পর্যাপ্ত ঘুম, পরিবারের সহায়তা ও মানসিক বিশ্রাম অপরিহার্য। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং বা সমর্থন গ্রুপে যেতে পারেন।
টীকা: প্রতিটি মায়ের পরিস্থিতি আলাদা। উপরের বিধিগুলো সাধারণ নির্দেশনা। কোনো বিশেষ সমস্যা মনে হলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।
কখন ডাক্তারের পরামর্শ প্রয়োজন?
নিচের লক্ষণগুলোর মধ্যে যেকোনো এক বা একাধিক দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে:
শিশুর ওজন স্বাভাবিকভাবে বাড়ছে না
দিনে ৬–৮ বার প্রস্রাব না হওয়া (শিশুর পর্যাপ্ত হাইড্রেশন সূচক)
শিশু সবসময় ক্ষুধার্ত ও অস্থির থাকলে
মায়ের স্তনে তীব্র ব্যথা, ফোলা, লালচে হয়ে যাওয়া বা কণ্ঠসঙ্কুচিত লক্ষণ দেখা দিলে
শিশুর জন্য মায়েদের বুকের দুধ নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ খাবার। যদিও দুধ কমে যাওয়ার ভয় খেতে হয়, অধিকাংশ সময় সঠিক দিকনির্দেশনা ও কিছু পরিবর্তনেই সমস্যা সমাধান করা যায়। নিয়মিত ঘন খাওয়ানো, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ ও মানসিক বিশ্রাম বজায় রাখলে দুধের পরিমাণ স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রয়োজনে ডা. মিশকাত আক্তারের মত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।