সিরাজগঞ্জে এইচআইভি ও এইডস সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি: রেড জোন ঘোষণা
বাংলাদেশে এইচআইভি ও এইডস প্রতিরোধে সরকার ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর নিরলস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সিরাজগঞ্জ জেলায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২৫৫ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশই ইনজেকটিভ ড্রাগ ব্যবহারকারী। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সিরাজগঞ্জে এইডস সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের অধীনে থাকা এআরটি (Antiretroviral Therapy) সেন্টার ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে এইচআইভি পরীক্ষা শুরু করে। পরীক্ষার সূচনালগ্নে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সেটি দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
মোট আক্রান্তের সংখ্যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২৫৫ জনে, যার মধ্যে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, শনাক্তের এই ক্রমবর্ধমান হারই প্রমাণ করে যে জেলায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
এইচআইভি সংক্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে “ইনজেকটিভ ড্রাগ ব্যবহার”। সিরাজগঞ্জ এআরটি সেন্টারের কাউন্সেলর ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন—
“২৫৫ জন আক্রান্তের মধ্যে ১৮৭ জনই ইনজেকটিভ ড্রাগ ব্যবহারকারী। এ ছাড়া কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ২৯ জন, সাধারণ নাগরিক ৩৫ জন এবং যৌনকর্মী ৪ জন।”
তিনি আরও বলেন, “অনেকে না বুঝে একই সিরিঞ্জে ইনজেকশন ব্যবহার করে নেশা গ্রহণ করে, যা একজন থেকে অন্যজনের মধ্যে এইচআইভি ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়।”
এই কারণে সিরাজগঞ্জকে ইতোমধ্যে রেড জোন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আক্রান্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল (ARV) ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিয়মিত কাউন্সেলিং, মানসিক সহায়তা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যাতে রোগীরা সমাজে পুনরায় মানসিক ভারসাম্য ফিরে পেতে পারে।
সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আকিকুন নাহার বলেন—
“নিম্ন আয়ের মানুষই সবচেয়ে বেশি ইনজেকটিভ ড্রাগ শেয়ার করে ব্যবহার করছে, যার ফলে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। আমরা চিকিৎসা সেবা দেওয়ার পাশাপাশি কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাদের মানসিকভাবে শক্ত করার চেষ্টা করছি।”
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সিরাজগঞ্জ শাখার সহকারী পরিচালক এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন—
“অবৈধ ইনজেকটিভ ড্রাগের বিপণন ও ব্যবহার রোধে নিয়মিত অভিযান চলছে। গত দুই বছরে প্রায় ১,৯০০ অ্যাম্পল ইনজেকটিভ ড্রাগ জব্দ করা হয়েছে।”
এদিকে সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন বলেন—
“এইডস প্রতিরোধে মাদকবিরোধী অভিযান আরও বেগবান করা হবে। ইনজেকটিভ ড্রাগ ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করে পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।”
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচআইভি প্রতিরোধে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ —
১. নেশা জাতীয় ইনজেকশন ও সিরিঞ্জ ভাগাভাগি বন্ধ করা,
২. সুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক বজায় রাখা,
৩. রোগ সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা ও সময়মতো পরীক্ষা করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজে এইচআইভি সম্পর্কে ভুল ধারণা ও কুসংস্কার এখনো বড় বাধা। অনেকেই রোগটি গোপন রাখে, যার ফলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ে। সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই বিষয়ে আলোচনা ও স্বাস্থ্য ক্যাম্পেইন বাড়ানো প্রয়োজন।
“রেড জোন” ঘোষণা মানে এই নয় যে এটি সমাজচ্যুত একটি এলাকা; বরং এটি একটি সতর্ক বার্তা, যা দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানায়। সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এইডস সংক্রমণ প্রতিরোধ সম্ভব।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মুহূর্তে প্রয়োজন—
যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সিরাজগঞ্জের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং বাংলাদেশে এইডস সংক্রমণ রোধে এটি একটি সফল মডেল হতে পারে।
রেফারেন্স / সূত্রঃ
১. সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল, এআরটি সেন্টার তথ্যভাণ্ডার (২০২০–২০২৫)
২. ডা. আকিকুন নাহার, তত্ত্বাবধায়ক, সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল
৩. মাসুদ রানা, কাউন্সিলর, ART Center, সিরাজগঞ্জ
৪. মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সিরাজগঞ্জ জেলা অফিস
৫. স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২৪