আপডেট
কবি কায়কোবাদের স্মৃতিবিজড়িত পিংনা রসপাল জামে মসজিদ: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিস্মৃতির করুণ অধ্যায় একজন আপোসহীন দেশনেত্রীর বিদায়: বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম ও উত্তরাধিকার স্বাস্থ্যখাত সংস্কার খসড়া ও ডিএমএফদের বাদ দেওয়ার বিতর্ক: জুলাই সনদের চেতনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? কিভাবে বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অধ্যাদেশ ২০২৫ (খসড়া) বাতিল বা সংশোধনের জন্য ইমেইল করবেন: সম্পূর্ণ ধাপে ধাপে গাইড বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অধ্যাদেশ ২০২৫: ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের তীব্র আপত্তি, বৈষম্য ও নীতিগত সংকটের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ ডায়াবেটিসে সুচবিহীন রক্ত পরীক্ষা: এমআইটির বিপ্লবী আলোভিত্তিক প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে গ্লুকোজ মনিটরিংয়ের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ ফুটবলের উত্থানের সময়ে তরুণদের অবিবেচক আচরণ: হামজা–শমিতদের উত্তরসূরীদের ভুল পদক্ষেপে নতুন বিতর্ক ডিএমএফ পরিচয়কে ধারণ করে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান: ডিএমএফ নিয়োগ বাস্তবায়ন পরিষদের পক্ষ থেকে বড় ঘোষণা ডিএমএফ নিয়োগ আন্দোলনের জরুরি নোটিশ: ৯ ডিসেম্বরের কর্মসূচি সাময়িক স্থগিত — ন্যায্য দাবির লড়াই অব্যাহত ডিএমএফদের নিয়োগ সংকট: কেন এখনই নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন জরুরি — ১৫ বছরের বাস্তবতা, আন্দোলন ও সমাধান বিশ্লেষণ

স্বাস্থ্যসেবায় মানবিকতা ও সংকট: কালিপদ বাবুর নিষ্ঠা ও উদারতার গল্প — ডাঃ সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী

কালিপদ বাবু মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে রোগীদের সেবা করছেন
কালিপদ বাবুর মানুষের জন্য নিবেদিত স্বাস্থ্যসেবা — ডাঃ সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী

স্বাস্থ্যসেবায় জটিলতার গল্প: কালিপদ বাবু (মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট) – বিচার চাই

 

কালিপদ দাস

আমার সাবেক সহকর্মী। তখন পদবী ছিল মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, যা বর্তমানে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নামে পরিচিত।

 

১৯৯৬ সালের ঘটনা

আমি আমার প্রথম কর্মস্থল জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ শুরু করি। এটি সিলেট বেল্টের সীমান্তবর্তী একটি দূরবর্তী অঞ্চল ছিল। তখন চিকিৎসক সংখ্যা চারজন, আমি একজন, একজন ইউএইচএফপিও, আমার বন্ধু আর একজন সিনিয়র এমও এমসিএইচ ও এফপি। খুব বিপদে পড়লে সিনিয়র ডাক্তারকে দায়িত্বে রাখতাম।

 

কাজের চাপ অসহনীয় ছিল। শুরুতে একজন সিনিয়র ভাই ছিলেন, ডাঃ শাহাবুদ্দিন, যিনি পরে ইংল্যান্ড চলে যান। তখন দুই বন্ধু মিলে পুরো সপ্তাহের জরুরি বিভাগ, ইনডোর ও আউটডোর সেবা চালানো খুবই কঠিন কাজ ছিল। এর মাঝে প্রায়ই বড় স্যারের দায়িত্ব নিতে হতো, যিনি নানা মিটিং ও প্রোগ্রামে ব্যস্ত থাকতেন।

 

এমন কঠিন পরিস্থিতিতে দুইজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও একজন পুরুষ এসএসএন আমাদের বহির্বিভাগের বিভিন্ন কোণ এবং জরুরি বিভাগে দারুণ সহযোগিতা করেছেন। এদের মধ্যে একজনই গল্পের নায়ক কালিপদ দাস।

 

কালিপদ বাবু

গ্রামের মানুষ তাকে ডাকত ‘কালি ডাক্তর’, ‘কালিপদ ডাক্তর’ বা ‘ডাক্তরবাবু’। তিনি ভীষণ ব্যস্ত মানুষ ছিলেন। প্রথম দিন থেকেই আমার অবাক লাগেছিল। ক্যাম্পাসে ঢুকার সাথে সাথে তিনি একটি কোয়ার্টারে থাকতেন। প্রথম দিন তার বাসার চারপাশে ভিড় দেখে জানতে পারি, রাতদিন মানুষ তাকে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করে।

 

কালিপদ বাবু সর্বদা হাসিখুশি ছিলেন। মাথায় কোকড়ানো চুল আর গাল ভরা পান। কখনো তাকে হাসি ছাড়া দেখিনি। কোন কাজ না বলতে শুনিনি। তিনি নিজে বলেছিলেন —

“প্রথম প্রথম পয়সার প্রয়োজনে করতাম, কিন্তু এখন রোগীর দারিদ্র্য ও ভালোবাসাই আমার প্রেরণা।”

 

একটি স্মরণীয় ঘটনা

একদিন আমি একা হাসপাতালেই ছিলেন, বন্ধু ও সিনিয়র ঢাকায়। ইউএইচএফপিওর দায়িত্বে আমি। দুপুরে বাজারে মিনিট বিশেকের জন্য বের হওয়া মাত্র। রিকশায় ফেরার পথে শুনতে পাই, কোন মিছিলের আওয়াজ—

“কালিপদ বাবুর শাস্তি চাই, কালিপদের দুই গালে…”

 

দ্রুত হাসপাতালে ফিরে কালিপদ বাবুকে নিরাপদ স্থানে সরাই। মিছিলের শব্দ বাড়তে থাকে। অভিযোগ: কালিপদ বাবু ডায়রিয়ার ওআরটি কর্ণারে ডিউটি করার সময় এক নতুন মাকে শিশুকে দুধ খাওয়ানোর নিয়ম বোঝাতে গিয়ে অসদাচরণ করেছেন।

 

আমি মিছিলের কয়েকজন নেতৃস্থানীয়কে আমার কক্ষে ডেকে এনে বিষয়টি স্থির করি। মহিলা জানান, কালিপদ বাবু শুধু বলেছিলেন—শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে, বুকের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে, বাচ্চার মুখে শুধু বোটা দেওয়া হবে না। অতিরিক্ত কিছু বলেননি।

 

আমি ছাত্রদের বুঝাই, কালিপদ বাবুর কথাগুলো দায়িত্বের অংশ। চিকিৎসক হিসেবে তিনি যা করতেন, সেটিই ছিল সঠিক। হাসপাতালের সীমিত সম্পদ, ডাক্তারদের অপ্রতুল সংখ্যা, এবং রোগীর চাপ—এসবই বিবেচনা করতে হবে।

 

ছাত্ররা দুঃখ প্রকাশ করে প্রতিশ্রুতি দেয়, ভবিষ্যতে যে কোন সমস্যা হলে আগে আমাকে জানাবে এবং তারপর সিদ্ধান্ত নেবে। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কালিপদ বাবুর কাছে ক্ষমা চায়।

 

এই ঘটনার মাধ্যমে আমি শিখেছি, স্বাস্থ্যসেবা, চাকুরি, রোগী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক—সবই জটিল। পরিস্থিতি এলে তা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়; বরং ম্যানেজ করতে জানতে হবে।

 

কালিপদ বাবু আজ কোথায় এবং কেমন আছেন জানি না। তবে সারাজীবন স্মরণ রাখব তার নিষ্ঠা, উদারতা এবং হাসিখুশি মনোভাব।

 

বেঁচে থাকলে ভালো থাকবেন কালিপদ বাবু।

দেশের সকল কালিপদ বাবুর জন্য শুভকামনা।

মহান স্রষ্টা সকলের কল্যাণ করুন।

 

— ডাঃ সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী, উপপরিচালক (হাসপাতাল-১), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন ।

 

 

কালিপদ বাবু ও প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবায় মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টদের ভূমিকা: ডাঃ শাফীর দৃষ্টিভঙ্গি

 

ডাঃ সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী, উপ-পরিচালক (হাসপাতাল-১), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে কালিপদ দাসের প্রতি যে ভালোবাসা, দায়িত্বশীলতা ও প্রফেশনাল মনোভাব প্রদর্শন করেছেন, তা শুধু ব্যক্তিগত সমর্থনই নয়, বরং একটি স্বাস্থ্য প্রশাসনিক দৃষ্টান্ত।

 

 

উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্বের সঠিক ব্যবহার

 

ডাঃ শাফী যেমন তার নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রকাশ করেছেন, তিনি শুধুমাত্র প্রশাসনিক কর্তব্যই পালন করেননি; বরং তিনি মানবিক সহমর্মিতা এবং ন্যায্য বিচার প্রদর্শন করেছেন।

 

সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা: হাসপাতালের সীমিত সম্পদ, রোগীর চাপ এবং কর্মীদের সংখ্যা অপ্রতুলতা থাকা সত্ত্বেও, তিনি শান্তভাবে ঘটনার মূল কারণ নির্ধারণ করে সমাধান করেছেন।

দায়িত্বশীলতা: তিনি মিছিল বা সরল অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেননি, বরং সত্যতা যাচাই করে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছেন।

মানবিক মূল্যবোধ: রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং শিক্ষামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটি পরিচালনা করেছেন।

 

 

এটি দেখায় যে উপ-পরিচালক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, বরং মানদণ্ডের সাথে মানবিকতার সংমিশ্রণ।

 

 

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় এসএসএমও / মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টদের ভূমিকা

 

এসএসএমও (Sub-Assistant Community Medical Officer) / মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট (ডিএমএফ) / কমিউনিটি মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টরা বাংলাদেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবার মূল স্তম্ভ। তাদের মূল ভূমিকা হলো:

 

১. প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান:

 

  • গ্রামের মানুষদের সাধারণ চিকিৎসা, টিকা, ওআরটি, মাতৃসেবা ও শিশুসেবা প্রদান।
  • রোগীর দ্রুত ও নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

 

 

২. স্বাস্থ্য শিক্ষাদান:

 

  • রোগীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা। যেমন শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর নিয়ম, পরিচ্ছন্নতা, রোগ প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ।
  • কমিউনিটি স্তরে সচেতনতা প্রচার।

 

 

 

৩. সামাজিক সমন্বয় ও রোগীর দায়িত্বশীলতা:

 

  • রোগী ও পরিবারকে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া।
  • স্বাস্থ্য প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করা।

 

 

 

৪. জরুরি ও বহির্বিভাগের সেবা:

 

  • হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোর সেবা পরিচালনা।
  • সীমিত চিকিৎসক থাকা অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ।
  • এদের উপস্থিতি গ্রামীণ হাসপাতাল এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির প্রান্তিক ব্যবধান কমায়।

 

 

কালীপদের মতো নিবেদিত গ্রাম্য ডাক্তার / ডিপ্লোমা চিকিৎসক প্রয়োজন কেন?

 

গ্রামীণ এবং প্রান্তিক এলাকার স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে কেবল শাস্তিমূলক বা প্রশাসনিক নীতি যথেষ্ট নয়। নিবেদিত এবং মানবিক চিকিৎসকের উপস্থিতি অপরিহার্য।

 

নিরন্তর রোগী সেবা: কালিপদ বাবুর মতো ডাক্তার রাতদিন মানুষের সেবা দিতে প্রস্তুত থাকেন।

 

ভালোবাসা ও উদারতা: রোগীর দারিদ্র্য, শিক্ষা অভাব বা সামাজিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সেবা প্রদান।

 

সচেতনতা ও শিক্ষা: শুধু চিকিৎসা নয়, রোগীর পরিবারের শিক্ষাও নিশ্চিত করেন, যেমন মাতৃশিশু সেবা বা স্বাস্থ্যকর অভ্যাস।

 

প্রান্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার শক্তি বৃদ্ধি: তার মতো চিকিৎসক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

 

 

 

ডাঃ শাফীর ভালোবাসা এবং দায়িত্বশীলতা, কালিপদ বাবুর নিষ্ঠা ও উদারতা—দুই মিলিয়ে একটি স্বাস্থ্যসেবার আদর্শ চিত্র ফুটে ওঠে। এসএসএমও, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় অমূল্য অবদান রাখেন।

 

দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে কালীপদের মতো নিবেদিত চিকিৎসক না থাকলে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাদের

প্রশিক্ষণ, অনুপ্রেরণা এবং মানবিক মনোভাবকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন এবং সমর্থন করা জরুরি।

 

 

রেফারেন্স/সূত্রঃ

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: ডাঃ সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী, উপপরিচালক (হাসপাতাল-১), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

ফেসবুক স্ট্যাটাস: ডাঃ সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী


সম্পাদক
মুহাম্মদ রাজু আহমেদ  
প্রকাশিত রবিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৫


আরো পড়ুন

প্রেগন্যান্সি ক্যালকুলেটর